বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও সরবরাহের পুরো ব্যবস্থার বড় অংশ পরিচালনা করে এই সংস্থাটি। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয়, মুনাফা, জ্বালানি তেল কেনাকাটা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠলেও এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অডিট করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কয়েক বছর আগে বিপিসির হিসাব আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষার তাগিদ দিয়েছিল। কিন্তু একাধিক সরকার পরিবর্তন হলেও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।
আইএমএফের সঙ্গে ২০১২ সালের এপ্রিলে তৎকালীন সরকার এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি চুক্তি করে। ওই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ৯৮৭ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়। ঋণের একটি অংশ ছাড়ের ক্ষেত্রে আইএমএফ শর্ত দেয়, বিপিসির আর্থিক হিসাব একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করাতে হবে।
তবে শুরুতে ওই শর্ত পূরণে অনীহা দেখানো হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও বিষয়টি আর এগোয়নি।
বিপিসির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত মুনাফা করতে শুরু করে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে বিপিসির নিট মুনাফা হয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা।
এই সময়ে শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়ে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের মুনাফার মধ্যে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা সরকারকে লভ্যাংশ, কর ও অন্যান্য বাবদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কিছু অর্থ উন্নয়ন প্রকল্প ও পরিচালন ব্যয়েও ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিপিসির নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী রাখার সুযোগ ছিল কি না।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সময় বিপিসির লোকসানের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলে ২২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার লোকসানের কথা উল্লেখ করে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়।
এর পর থেকেই বিপিসির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, মুনাফা ব্যবস্থাপনা এবং হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, বিপিসির হিসাব ব্যবস্থায় আরও বেশি স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
তার মতে, প্রতিষ্ঠানটি যখন মুনাফা করে তখন তার সুফল সাধারণ ভোক্তারা সরাসরি পায় না, আবার লোকসানের কারণ দেখিয়ে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়। এ কারণে বিপিসির আয়-ব্যয় ও হিসাব প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হলে সরকারের নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর হতে পারে এবং ভোক্তার আস্থাও বাড়তে পারে।
বিপিসির জ্বালানি তেল আমদানি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে জ্বালানি আমদানির পরিমাণ ও ব্যয়ের তথ্যে পার্থক্য দেখা গেছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। ওই সময়ে বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, সংস্থাটি সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি মূল্যের জ্বালানি তেল আমদানি করে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য আমদানি করা জ্বালানি হিসাব করলে পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের মতো। অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে শুল্কায়িত জ্বালানি তেলের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।এই ভিন্ন তথ্যের কারণে প্রকৃত আমদানি ব্যয় ও পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
বিপিসির বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অডিট আপত্তি উঠেছে। ২০২২ সালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বিপিসির কয়েকটি বছরের অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি নিয়ে আলোচনা হয়।
সেখানে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের বিষয় উঠে আসে বলে জানা যায়।
বিপিসির ২০০৯-১০, ২০১০-১১ এবং ২০১১-১২ অর্থবছরের অডিট আপত্তির বিষয়ে নথিপত্র চাওয়া হলেও সে সময় তা যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
একটি অডিট আপত্তিতে বিপিসির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পে দেওয়া ঋণের হিসাবেও বড় ধরনের পার্থক্যের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে প্রায় ২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার গরমিলের কথা বলা হয়।
বিপিসির জ্বালানি তেল কেনাকাটায় দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে।খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দরপত্রের মাধ্যমে জ্বালানি তেল কেনার ক্ষেত্রে বারবার একই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগ পেয়ে থাকে। বিশেষ করে প্রিমিয়াম মূল্যে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ যাচাইয়ের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা এখনো হয়নি।
বিপিসির সাবেক চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তবে তিনি নিজে প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা বাড়াতে কস্ট অডিটের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
বর্তমান বিপিসি চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মানের নিরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিপিসির হিসাবকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য আইনগত বিষয় বিবেচনা করে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে বিপিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ নিরীক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলে শুধু সরকারের নীতিনির্ধারণ নয়, সাধারণ ভোক্তার আস্থাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।

