বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে সংকট থেকে বের করে আনতে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। খেলাপি ঋণ আদায়, কঠোর তদারকি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাকেই এই পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার প্রবণতায় দেশের অনেক ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ, যা ব্যাংকগুলোর মূলধন ও মুনাফার ওপরও বড় চাপ তৈরি করেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।
একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মূলধনের বিপরীতে মুনাফার হারও ব্যাপকভাবে কমেছে। ২০১৬ সালে যেখানে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা নেমে গেছে ঋণাত্মক ১৬ দশমিক ১১ শতাংশে।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন হবে সংস্কার
‘জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১ পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো: সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক পরিকল্পনাটি তৈরি করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ। গত ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ এটি অনুমোদন করে। বুধবার পরিকল্পনাটি প্রকাশ করা হয়।
পাঁচ বছরের সংস্কার কার্যক্রম তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রথম বছরে সংকট নিয়ন্ত্রণ, পরবর্তী দুই বছরে ব্যাংকগুলোর ভিত্তি পুনর্গঠন এবং শেষ দুই বছরে দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর সংস্কারের দিকে এগোনোর কথা বলা হয়েছে।
প্রথম বছরেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক ও খেলাপি ঋণে নজর
সংস্কার পরিকল্পনার প্রথম বছরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক, খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের সুরক্ষায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনায় অন্তর্বর্তী পর্যায়ে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হবে। উচ্চঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকগুলোর ওপর বাড়ানো হবে তদারকি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা।
ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি ঋণ শ্রেণীকরণ ও সংরক্ষণসংক্রান্ত নিয়ম আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে, যাতে নতুন করে খেলাপি ঋণ জমতে না পারে।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় যোগ্যতা যাচাইয়ের নির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে। যারা এসব মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হবে, তাদের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হবে।
আমানতকারীদের সুরক্ষায় আমানত সুরক্ষা তহবিল কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মূলধন শক্তিশালী করা এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। সংকটে থাকা ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
এই পর্যায়ে সরকারের মূল লক্ষ্য হবে নিয়ম কার্যকর করা, সুশাসনের দুর্বলতা দূর করা, খেলাপি ঋণ আদায়, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং ব্যাংক খাতে পর্যাপ্ত তারল্য বজায় রাখা।
পরের দুই বছরে ব্যাংকের ভিত শক্ত করার পরিকল্পনা
সংস্কারের দ্বিতীয় ধাপে ব্যাংকগুলোর সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ আদায় ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। একই সঙ্গে আর্থিক নিরাপত্তাব্যবস্থাও আরও মজবুত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ কার্যকরী স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী ব্যাংক তদারকি এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন পরিস্থিতির পরীক্ষা চালু করা হবে।
ঋণ পুনঃতফসিলের নিয়ম আরও কঠোর করা হবে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর বাড়তি নজর রাখা হবে এবং ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে বিদ্যমান নিয়ম আরও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগের প্রক্রিয়াও একক মানদণ্ডের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মেয়াদ এবং একই পরিবারের সদস্যদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও সীমা নির্ধারণ করা হবে।
ব্যাংকগুলোকে পৃথকভাবে নিজেদের আর্থিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বাসেল-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিবেদনের মান অনুসরণ করতে হবে।
শেষ ধাপে আসবে গভীর সংস্কার
পরিকল্পনার শেষ দুই বছরে ব্যাংকগুলোকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার পাশাপাশি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সুশাসন ও স্বচ্ছতা বাড়ানো, তথ্যব্যবস্থা আধুনিক করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকরী স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করতে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষায়িত আর্থিক ট্রাইব্যুনাল, শক্তিশালী আইনি প্রয়োগ এবং দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া আমানতকারীদের সুরক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে এমন একটি ব্যবস্থাও চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে সংকটে পড়া ব্যাংকের আমানতকারীদের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দ্রুত অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে।
শুধু ঋণ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না
সরকারের পরিকল্পনায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে—শুধু ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়িয়ে বর্তমান সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
প্রথমে ব্যাংকগুলোর আর্থিক হিসাব শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য ঋণ পুনর্গঠন, নিয়ম মেনে লোকসানি ঋণ হিসাব থেকে বাদ দেওয়া এবং খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায়ের ওপর জোর দেওয়া হবে।
ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার পর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষি এবং উৎপাদনশীল খাতে নিরাপদ ঋণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনায় ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ, বিশেষ সুবিধায় ঋণ দেওয়া এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়েছে এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার?
নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্কারের নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়গুলো সমন্বয় করবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের মান, তারল্য, সুশাসন, আমানতকারীদের আস্থা এবং স্বচ্ছতার মতো সূচকের ভিত্তিতে সংস্কারের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর সংস্কারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। পাশাপাশি ২০২৮ অর্থবছরে একটি মধ্যমেয়াদি মূল্যায়ন করা হবে। সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনায় পরিবর্তনের সুপারিশ করা হবে।
সরকার মনে করছে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতির কারণে ব্যাংক খাতের এই সংস্কার এখন আরও জরুরি। কারণ উত্তরণের পর সহজ শর্তের অর্থায়ন ও বৈদেশিক তারল্য সহায়তা কমে যেতে পারে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়বে।
তবে পাঁচ বছরের এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে কাগজে থাকা সংস্কারগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। খেলাপি ঋণ আদায়, রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হলে বড় কোনো পরিকল্পনাই ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের সংকট কাটাতে পারবে না।

