সরকারের ব্যাংকঋণ নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নিলামে পনেরো ও বিশ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ ও ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। এর আগের নিলামে এই দুই মেয়াদের বন্ডের সুদহার ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ১০ শতাংশ ও ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ—অর্থাৎ স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই সুদহারে লক্ষণীয় বৃদ্ধি ঘটেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ সরকারের অর্থের প্রয়োজন বেড়ে যাওয়া, অথচ হাতে থাকা তহবিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদহারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেকজন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ঋণগ্রহণ ক্যালেন্ডারের বাইরে গিয়ে আগামী অক্টোবর মাসে ট্রেজারি বন্ড নিলামের মাধ্যমে অতিরিক্ত পনেরো হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর পাশাপাশি নভেম্বর মাসে একই ক্যালেন্ডারের বাইরে আরও ছয় হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন, যেখানে আগামী অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত—এই তিন মাসে সরকার ব্যাংক থেকে সম্ভাব্য কী পরিমাণ ঋণ নিতে পারে, তার একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়। বৈঠকের আলোচনা অনুযায়ী, অক্টোবর ও নভেম্বর মিলিয়ে নির্ধারিত ক্যালেন্ডারের বাইরে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট একুশ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এই পুরো পরিস্থিতি ঘটছে এমন একসময়ে, যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির ভবিষ্যৎ দিক নিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার দশ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে নয় শতাংশে নামিয়ে আনে, যার ফলে বাজারে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে সামনে সুদহার আরও কমতে পারে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাবে সার্বিক পণ্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহারে কোনো পরিবর্তন আনে কি না, তা নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা। বরং অনেকের মধ্যে এখন এমন প্রত্যাশাও তৈরি হচ্ছে যে সুদহার অপরিবর্তিত থাকতে পারে, এমনকি বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নিজেদের নীতি সুদহার সাড়ে তিন দশমিক সাত পাঁচ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে চার শতাংশে উন্নীত করেছে।
অন্যদিকে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এখনো তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কৌশলগতভাবে নীতি সুদহার কমিয়েছিল ঠিকই, তবে তার সুফল এখনো বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিতে সেভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সর্বশেষ জুলাই মাসের হিসাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, যা প্রত্যাশার তুলনায় বেশ কম।
এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা তহবিল থেকেও ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত হারে ঋণ নিচ্ছেন না। সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে নতুন ঋণের চাহিদা সামগ্রিকভাবে কম থাকাই এর প্রধান কারণ।
সব মিলিয়ে বাজারের চিত্র এখন মিশ্র। বর্তমানে তিনটি ভিন্ন মেয়াদের ট্রেজারি বিলের সুদহারই সাড়ে আট শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর আগে টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রায় সব ধরনের ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতায় ছিল। ফলে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি হারের মধ্যে এই বিপরীতমুখী গতিপ্রকৃতি বাজার পর্যবেক্ষকদের নজর কাড়ছে, এবং আগামী দিনগুলোতে সরকারের ঋণনীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির মধ্যকার সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে সুদের হারের ভবিষ্যৎ দিক।

