দেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এই ধারার ব্যাংকগুলোতে একদিকে যেমন আমানত কমে যাচ্ছে, তেমনি আগের তুলনায় কমেছে প্রবাসী আয়ের প্রবাহও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ পরিসংখ্যান বলছে, এক বছরের ব্যবধানে এসব ব্যাংকের আমানত কমেছে চার হাজার দুইশ কোটি টাকার বেশি।
গত জুন মাস পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশিরভাগ সূচকেই মিশ্র প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে আমানত ও রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দেশে বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার দশটি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে সংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত হচ্ছে একটি নতুন সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক। বিশ্লেষকদের মতে, এই পাঁচ ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থার ঘাটতিই সামগ্রিক আমানত হ্রাসের একটি বড় কারণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের দুর্বল আর্থিক পারফরম্যান্সই মূলত আমানত কমার প্রধান কারণ। বর্তমানে এই পাঁচ ব্যাংকে গ্রাহকদের জমানো অর্থের পরিমাণ ইসলামি ধারার মোট আমানতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। কিন্তু গ্রাহকেরা এসব ব্যাংকে নতুন করে টাকা রাখতে খুব একটা আগ্রহী নন, কারণ প্রয়োজনের সময় নিজেদের জমানো অর্থ চাহিদামতো তুলতে পারছেন না তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ নির্দিষ্ট একটি সীমা পর্যন্তই টাকা তুলতে পারছেন, যা আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে অতীতের বিভিন্ন অনিয়মের ছায়াও। বিগত সরকারের আমলে এসব ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ লোপাটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এছাড়া তৎকালীন সরকারঘনিষ্ঠ একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী চাপ প্রয়োগ করে একটি শীর্ষস্থানীয় ইসলামি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে প্রবাসীদের মধ্যেও এসব ব্যাংকে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে একধরনের দ্বিধা কাজ করছে— অর্থ পাঠানোর পর তা সহজে তোলা যাবে কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তাই এর মূল কারণ।
হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের দশটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন লাখ ঊননব্বই হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল সামান্য বেশি। আমানতের সিংহভাগই এখনো মুদারাবাভিত্তিক স্কিমে জমা রাখছেন গ্রাহকেরা, আর মোট আমানতের বড় অংশ আসছে বেসরকারি খাত থেকে।
তবে এই নেতিবাচক প্রবণতার মধ্যেও ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছে একটি ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তাদের আমানত ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং পরিচালন মুনাফাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তার ভাষ্যমতে, সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনুকূল না থাকায় সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তবে আমানতকারীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া মিলছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পতন হয়েছে। জুন মাসে ইসলামি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় সাতাশ শতাংশ কমে গেছে। তবে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে এই সময়ে।
আমানত কমলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে ইসলামি ব্যাংকগুলোর। সুকুকসহ মোট বিনিয়োগ বেড়েছে সাড়ে তিন শতাংশের বেশি, যার সবচেয়ে বড় অংশ গেছে শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে। তবে জনবলের ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র— এক বছরের ব্যবধানে এই ব্যাংকগুলোতে প্রায় চার হাজার কর্মী কমেছে, যার পেছনে গত দুই বছরের প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা ও পুরোনো নিয়োগ পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট— ইসলামি ধারার ব্যাংকিং খাত এখনো আস্থা সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এবং গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনে স্বাভাবিকতা ফিরলেই কেবল এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

