ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের বোঝা দিন দিন বাড়ছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৩০.৬০ শতাংশ এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। আর আদালতে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত মামলা রয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৪১টি। এই বিশাল সংকট মোকাবিলায় কঠোর ১৮ মাসের একটি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত ২৬ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। পরিকল্পনার প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা হবে। পরবর্তী ১২ মাসে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর জন্য দুটি আইন প্রণয়ন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ এবং ‘অর্থঋণ আদালত আইন’-এর সংশোধন। এই আইনগুলোর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের মামলা সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, দুটি আইনের খসড়া প্রণয়নের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তা চূড়ান্ত হবে। একইসঙ্গে ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে তাদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিরা শাস্তির মুখোমুখি হন।
একটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণের এই বিশাল পরিমাণ ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। কিছু ব্যাংক নতুন ঋণ দিতে পারছে না। উচ্চ খেলাপি হার সুদহার কমতেও বাধা দিচ্ছে। ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে বাধ্য হওয়ায় শেয়ারহোল্ডাররা কম লভ্যাংশ পাচ্ছেন। সরকারও কম রাজস্ব পাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুদ্রানীতি পর্যালোচনা। এখন থেকে প্রতি ছয় মাসের পরিবর্তে প্রতি তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি পর্যালোচনা করা হবে। কমিটির সদস্যরা মত দিয়েছেন, উচ্চ সুদহার ব্যবসা-বিনিয়োগের প্রধান বাধা। তারা ইসলামী ব্যাংকিংকে ভবিষ্যতের মুদ্রানীতিতে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং করা হবে। কমিটি সুদহার কমানো এবং ঋণের কার্যকর সুদহার কমিয়ে আনার সুপারিশ করেছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ১৮ মাসের পরিকল্পনা একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। প্রথম ছয় মাসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রাখা হলেও পরবর্তী ১২ মাসে আইনি কঠোরতা কার্যকর হবে। নতুন আইন প্রণয়ন, মামলা নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ এবং প্রকৃত ঋণগ্রহীতাদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ, এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে। তবে এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে আইন প্রণয়নের গতি, আদালতের কার্যকারিতা এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার ওপর।

