খেলাপি ঋণের চাপ, অর্থ পাচারের অভিযোগ ও বড় ঋণের অনিয়ম ঠেকাতে নতুন ব্যবস্থায় যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা হলো—ঋণ বিতরণের পর সেই অর্থ প্রকৃত উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ বা উৎপাদন বৃদ্ধির কথা বলে নেয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হয়নি। কোথাও অর্থ চলে গেছে অন্য প্রতিষ্ঠানে, কোথাও সম্পদ কেনায়, আবার কোথাও বিদেশে পাচারের অভিযোগও উঠেছে। এর ফল হিসেবে বেড়েছে খেলাপি ঋণ, দুর্বল হয়েছে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা।
এই পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের ঋণের ব্যবহার সরাসরি পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ব্যবস্থার আওতায় ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, তা যাচাইয়ের জন্য অডিট রিপোর্ট জমা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এখন থেকে শুধু ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করেই ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ হবে না; ঋণের অর্থ বাস্তবে নির্ধারিত কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটিও নজরদারির মধ্যে থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ অতীতে দেখা গেছে, বড় ঋণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ ছাড় করার কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েও তা ফেরত দেয়নি। এর বোঝা শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতিকেই বহন করতে হয়েছে।
বড় ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ঋণের ঝুঁকি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত মার্চ প্রান্তিকের হিসাব বলছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ ইতোমধ্যে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি হয়েছে। এক বছর আগে অর্থাৎ মার্চ ২০২৫-এ এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ।
একই সময়ে বড় ঋণের মোট পরিমাণও বেড়েছে। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ একদিকে বড় ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে এসব ঋণের একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে।
ব্যাংকিং খাতের জন্য এটি একটি বড় সতর্ক সংকেত। কারণ বড় ঋণের একটি অংশ খেলাপি হলে তার প্রভাব ছোট ঋণের তুলনায় অনেক বেশি হয়। একটি বড় প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ ব্যর্থতা একটি ব্যাংকের মূলধন, তারল্য ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
অতীতের অনিয়মের খেসারত এখনো দিতে হচ্ছে
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো বড় ঋণের অপব্যবহার। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দুর্বল যাচাই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তবতা, জামানতের মূল্য এবং ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।
এস আলম গ্রুপকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এই সমস্যাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০টি ব্যাংক এবং একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এসব ঋণের বড় একটি অংশ বিভিন্ন কোম্পানি, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের বাজারমূল্য ছিল আনুমানিক ৩২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ঋণের তুলনায় জামানতের মূল্য ছিল অনেক কম।
এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিষয় নয়; বরং এটি পুরো ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার একটি উদাহরণ। কারণ একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যদি এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বের করে নিতে পারে, তাহলে ঋণ অনুমোদন, গ্রাহক যাচাই, প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ এবং ঋণের ব্যবহার পর্যবেক্ষণের একাধিক স্তরে দুর্বলতা ছিল বলেই ধরে নিতে হয়।
কাগজে প্রকল্প, বাস্তবে অন্য ব্যবহার
ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় সাধারণত নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য দেখাতে হয়। কেউ কারখানা স্থাপনের জন্য ঋণ নেয়, কেউ ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য, কেউ আবার যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল কেনার জন্য অর্থ নেয়।
কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, ঋণের অর্থ ঘোষিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে না। একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া অর্থ অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত সম্পদ কেনায় ব্যবহার হচ্ছে অথবা অন্য ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—ঋণের বিপরীতে যে উৎপাদন বা ব্যবসায়িক আয় তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেটি আর হয় না। ফলে একসময় সেই ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যাংক, আমানতকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতি।
এই বাস্তবতা থেকেই ঋণের অর্থ ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
কেন ৫০ কোটি টাকার সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে?
৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার পেছনে রয়েছে আর্থিক ঝুঁকির বিষয়টি। ছোট ঋণের তুলনায় বড় ঋণের একটি ব্যর্থতা ব্যাংকের ওপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলে।
তাই বড় ঋণের ক্ষেত্রে শুধু কাগজপত্র যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে—
- প্রকল্প বাস্তবে হয়েছে কি না,
- যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে কি না,
- উৎপাদন শুরু হয়েছে কি না,
- ব্যবসায়িক আয় তৈরি হচ্ছে কি না এবং
- ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যয় হয়েছে কি না।
অডিট রিপোর্ট বাধ্যতামূলক করা হলে ঋণগ্রহীতাকে অর্থ ব্যবহারের একটি পরিষ্কার হিসাব দিতে হবে। এর ফলে ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানতে পারবে অর্থের প্রকৃত গতিপথ।
শুধু অডিট নয়, দরকার কার্যকর তদারকি
তবে শুধু অডিট রিপোর্ট গ্রহণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অডিট ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা।
কারণ কোনো অডিট যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, তাহলে প্রকৃত অনিয়ম ধরা পড়বে না। তাই অডিট প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, রিপোর্ট যাচাই এবং সন্দেহজনক তথ্যের ক্ষেত্রে সরাসরি তদন্তের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বড় ঋণের জামানত হিসেবে দেওয়া জমি ও সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
একটি কার্যকর ব্যবস্থায় তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথমত, ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহক ও জামানত যাচাই।
দ্বিতীয়ত, ঋণ দেওয়ার পর অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ।
তৃতীয়ত, অনিয়ম ধরা পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
পাঁচ ব্যাংকের সংকট বড় সতর্কবার্তা
বড় ঋণের অনিয়মের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে দুর্বল হয়ে পড়া কয়েকটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে। এস আলমসংশ্লিষ্ট ঋণের কারণে চাপের মুখে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ব্যাংকগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক।
২০২৬ সালের আগস্টে এসব ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একক ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, বড় ঋণ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
অর্থ পাচার ঠেকাতেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
বড় ঋণের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ শুধু খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে অর্থ পাচার প্রতিরোধের বিষয়টিও জড়িত।
ঋণের অর্থ যদি অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়, কৃত্রিম বাণিজ্যিক লেনদেন দেখানো হয় অথবা বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই ঋণের অর্থ ব্যবহারের অডিটে ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের তথ্য, আমদানি-রপ্তানি নথি, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সম্পর্ক যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে একই মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের অর্থ ঘোরানোর প্রবণতা বন্ধ করতে প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন
নতুন উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের সংখ্যা অনেক হলে প্রতিটি ঋণের অডিট ও যাচাইয়ের জন্য পর্যাপ্ত জনবল, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা প্রয়োজন হবে।
একই সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আলাদা সুবিধা বন্ধ করতে হবে। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং স্বার্থের সংঘাত বড় ঋণের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু নতুন নিয়ম করলেই হবে না; নিয়মের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, বড় ঋণের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু “কত টাকা ঋণ দেওয়া হলো” নয়, বরং “সেই টাকা কোথায় গেল এবং কী ফল তৈরি করল”—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।
৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ব্যবহার যাচাইয়ের উদ্যোগ যদি স্বচ্ছতা, স্বাধীন অডিট এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এটি দেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও জবাবদিহিমূলক ও নিরাপদ করার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

