দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের বড় অংশই রয়েছে জনতা ব্যাংকে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয় ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য আবদুল আলীমের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকের।
জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংকটির মোট ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকার খেলাপি ঋণের বড় অংশ আটকে আছে কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছে। তাদের দাবি, ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই রয়েছে শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের কাছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো, এস আলম ও আননটেক্সসহ কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গ্রুপ।
বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে জনতা ব্যাংকের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ আটকে রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ক্রিসেন্ট গ্রুপ, থার্মেক্স গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপও বড় খেলাপি গ্রাহকদের তালিকায় রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দেশে ১৩টি বেসরকারি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পেয়েছে।
বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৬২টি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
তিন মাসের ব্যবধানে অর্থাৎ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে যায়। আগের সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। এর ছয় মাস আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুনে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতাকেই দুর্বল করে না, বরং পুরো অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই খেলাপি ঋণ আদায়, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এবং ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

