ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে জামানতের মূল্য অতিরিক্ত দেখিয়ে অনিয়মের সুযোগ বন্ধ করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে বড় অঙ্কের ঋণের বিপরীতে দেওয়া সম্পদের মূল্যায়ন নির্দিষ্ট অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করতে হবে।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৩১টি প্রতিষ্ঠানকে জামানত মূল্যায়নকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ কোটি টাকা বা তার বেশি পরিমাণ ঋণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই জামানতের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
তবে ১ কোটি টাকার কম ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যায়নের সুযোগ থাকছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পাওয়ার উদ্দেশ্যে জামানতের সম্পদের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়। এর ফলে প্রকৃত সম্পদের তুলনায় বেশি ঋণ অনুমোদন হয় এবং পরবর্তীতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়ে। এই ধরনের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করতেই নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর জারি করা নীতিমালার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে যাচাই করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত হতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বীকৃত জরিপ বা হিসাবরক্ষণ সংস্থার সদস্যপদ, কমপক্ষে তিন বছরের অভিজ্ঞতা, দক্ষ প্রকৌশলী, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং পরিষ্কার ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) রেকর্ড থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
মূল্যায়নের মান ও সক্ষমতার ভিত্তিতে ১৩১টি প্রতিষ্ঠানকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮টি প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে ‘গ্রুপ এ’ এবং ৩৩টিকে ‘গ্রুপ বি’ শ্রেণিতে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ অনুমোদন, বৃদ্ধি বা নবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে অন্তত দুটি পৃথক মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জামানতের মূল্য যাচাই করতে হবে। এর মধ্যে অন্তত একটি প্রতিষ্ঠান অবশ্যই ‘গ্রুপ এ’-এর হতে হবে।
এ ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার আগের প্রান্তিকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি হলে, ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে শুধু ‘গ্রুপ এ’ তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান দিয়েই জামানত মূল্যায়ন করাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, দুটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনের মধ্যে অথবা বাইরের মূল্যায়ন ও ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নের মধ্যে পার্থক্য ২০ শতাংশের বেশি হলে সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠানকে এর কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।
তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদনের মেয়াদ থাকবে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগে তাদের নবায়নের আবেদন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি বছর ১৫ জানুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট-১ (বিআরপিডি-১)-এ বার্ষিক কার্যক্রম প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভঙ্গ করলে, পেশাগত অবহেলা করলে বা সম্পদের মূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করলে তাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংক সংরক্ষণ করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি কমানো, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং অতিমূল্যায়িত জামানতের মাধ্যমে ঋণ জালিয়াতি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

