ব্যাংকের ভল্টে টাকা আছে অথচ একজন উদ্যোক্তা ঋণ নিতে গেলে ফিরে আসছেন খালি হাতে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এই মুহূর্তে ঠিক এই বৈপরীত্যই ঘটছে। জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত তেত্রিশ বছরে সর্বনিম্ন। ঠিক একই সময়ে ব্যাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটিতে (এসডিএফ) জমা রেখেছে রেকর্ড ১.৫ লাখ কোটি টাকা। একদিকে টাকার স্তূপ, অন্যদিকে ঋণের আকাল; এই সমীকরণ যত সহজ শোনায়, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক জটিল।
টাকা থাকা মানেই ব্যাংক সুস্থ, এই ধারণা ভুল
সংখ্যাগুলো একসঙ্গে রাখলে গল্পটা পরিষ্কার হয়। মার্চ মাস শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছিল ৫.৮৯ লাখ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিন টাকার প্রায় এক টাকাই এখন খেলাপি। আর এখানেই একটি নতুন তথ্য যোগ করা দরকার, মার্চের এই পরিসংখ্যান দিয়ে থেমে থাকলে চলবে না। জুন মাস শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.০৭ লাখ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের প্রায় ৩২.৮ শতাংশ। মানে সমস্যাটা কমছে না, বরং প্রতি প্রান্তিকেই নতুন করে বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এই অবস্থার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো – শুধু খেলাপি ঋণ বাড়েনি, ব্যাংক খাতের মূলধন-ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ অনুপাত (সিআরএআর) ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে নেমে গেছে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে। এই একটি সংখ্যাই বলে দেয় কেন প্রচুর নগদ টাকা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক খাতকে সুস্থ বলা যাচ্ছে না। তারল্য আর মূলধন এক জিনিস নয়; তারল্য দিয়ে দৈনন্দিন লেনদেন চলে, কিন্তু কোনো ঋণ খেলাপি হলে সেই ক্ষতি শোষণ করে মূলধন। বছরের পর বছর খারাপ ঋণের বোঝা যখন মূলধনকেই খেয়ে ফেলে, তখন হাতে নগদ টাকা থাকলেও একটি ব্যাংক ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা এতটাই গুরুতর যে গত জুনে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে ৪৫ কোটি ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যার মূল উদ্দেশ্যই হলো আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনের কাঠামো তৈরি করা।
কেন ব্যাংকগুলো নিজেরাই ঋণ দিতে দ্বিধায়
এত বিপুল খেলাপি ঋণের পেছনের গল্পটা রাতারাতি তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ অনুমোদন, একই গোষ্ঠীর ভেতরে ঋণ দেওয়া-নেওয়া, বারবার ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ আর দুর্বল আদায় ব্যবস্থা মিলে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে। যখন মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খেলাপি, তখন একটি ব্যাংকের কাছে টাকা আছে কি না, সেটা আর মূল প্রশ্ন থাকে না। আসল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, নতুন ঋণগ্রহীতা আদৌ টাকা ফেরত দেবেন কি না, আর দিতে ব্যর্থ হলে সেই ক্ষতি সামলানোর মতো মূলধন ব্যাংকের হাতে অবশিষ্ট আছে কি না। এভাবেই গতকালের খারাপ ঋণ আজকের ভালো ঋণ দেওয়ার সামর্থ্যকে বেঁধে ফেলছে।
ব্যবসায়ীরাও কি সত্যিই ঋণ চাইছেন
তবে দোষ শুধু ব্যাংকের ঘাড়ে চাপালে অর্ধেক গল্প বলা হবে। চাহিদার দিকটাও সমান দুর্বল। ব্যাংকে টাকা থাকলেই কেউ ঋণ নেয় না, নেয় তখনই, যখন নতুন কারখানা বানানো, যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা উৎপাদন বাড়ানোর মতো লাভজনক সুযোগ চোখের সামনে থাকে। উচ্চ সুদহার, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা, গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি আর সামগ্রিক অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগকে অনাকর্ষণীয় করে তুলেছে। একটি চালু কারখানাই যদি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস বা বিদ্যুতের অভাবে পুরো সক্ষমতায় চলতে না পারে, তাহলে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আরেকটি কারখানা গড়ার ঝুঁকি কেউ কেন নেবে? পরিসংখ্যানেও এই দুর্বলতা স্পষ্ট। বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি মার্চে ৪.৭২ শতাংশ, এপ্রিলে ৪.৭৫ শতাংশ, মে মাসে ৪.৯৮ শতাংশ হয়ে জুনে আবার নেমে এসেছে ৪.৪৭ শতাংশে, টানা চার মাস ধরে যা পাঁচ শতাংশের নিচে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের জন্য বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রেখেছে মাত্র ৬.৮ শতাংশ; যা বলে দেয়, নীতিনির্ধারকরাও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছেন না। জুন মাসে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯.১৬ শতাংশে নেমেছে ঠিকই, কিন্তু তা এখনও ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় ঋণের প্রতি আগ্রহ ফেরাতে খুব একটা সাহায্য করছে না।
সরকারও তো ব্যাংকের দুয়ারে দাঁড়িয়ে
এই সংকটে আরেকটি স্তর যোগ করেছে সরকারের নিজের ঋণের ক্ষুধা। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকায়, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বেশি। জুন শেষে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি খাতে তা মাত্র ৪.৪৭ শতাংশ। এই তুলনাটিই বলে দেয় ব্যাংকের টাকা কোথায় বেশি সহজে যাচ্ছে। এটাকে পুরোপুরি “ক্রাউডিং আউট” বলা অবশ্য বিভ্রান্তিকর হবে, কারণ বেসরকারি ঋণ দুর্বল হওয়ার একটা বড় কারণ ব্যবসায়ীদের নিজেদের অনীহাও। তবু একটি ব্যাংকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা হিসাবটা সহজ, সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি কম, রিটার্ন মন্দ নয়, আর কোনো ব্যবসার নগদ প্রবাহ যাচাই বা বছরের পর বছর খেলাপি ঋণ আদায়ের পেছনে দৌড়াতে হয় না। এখানেই আসল বিপদ; যখন একটি ব্যাংকের জন্য যা যুক্তিসংগত, গোটা অর্থনীতির জন্য তা নাও হতে পারে। ব্যাংকগুলো যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা রেখে বা সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করেই সন্তোষজনক মুনাফা পেয়ে যায়, তাহলে কষ্ট করে ভালো ব্যবসায়ী খুঁজে ঋণ দেওয়ার তাগিদ তাদের মধ্যে ক্রমেই কমে আসে।
সুদহার কমালেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক আগস্টের শুরুতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫ শতাংশে নামিয়েছে। গত ছয় বছরের মধ্যে এটিই প্রথম হার কমানো। যুক্তিসংগতভাবেই আশা করা হচ্ছে, ধীরে ধীরে ঋণের খরচ কমলে কিছু বিনিয়োগ আবার লাভজনক হয়ে উঠবে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক অর্থনৈতিক নীতি মনে রাখা দরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার সরবরাহ বাড়াতে পারে, সুদহার কমাতে পারে, কিন্তু কোনো ব্যাংককে বাধ্য করতে পারে না বিশ্বাসযোগ্য ঋণগ্রহীতা খুঁজে বের করতে, আবার কোনো ব্যবসায়ীকেও বাধ্য করতে পারে না বিনিয়োগ করতে, যদি প্রত্যাশিত রিটার্ন সেই ঝুঁকির যোগ্য না মনে হয়। সুদহার কমানো তাই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যালান্স শিট মেরামত করতে পারে না, খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারে না, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মূলধন ফিরিয়ে দিতে পারে না। আর্থিক নীতির এই সীমাবদ্ধতা বোঝাটা জরুরি, কারণ অনেকেই একে একমাত্র সমাধান ভেবে ভুল করেন।
আসল সমস্যা টাকার নয়, প্রতিষ্ঠানের
সব মিলিয়ে যে ছবিটা ফুটে ওঠে, তা হলো, বাংলাদেশের সমস্যা এখন আর ব্যাংকে টাকা কম থাকা নয়। সমস্যা হলো সেই টাকাকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া। ব্যাংক খাতের দিক থেকে প্রথম কাজ হলো প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ স্বীকার করে নেওয়া। যেসব ব্যাংক টিকে থাকার মতো, তাদের বিশ্বাসযোগ্য পুনর্গঠন পরিকল্পনার আওতায় মূলধন জোগান দিতে হবে, আর যাদের স্বাধীনভাবে টিকে থাকার বাস্তবসম্মত পথ নেই, তাদের জন্য প্রয়োজন সুশৃঙ্খল পুনর্গঠন। ঋণ অনুমোদন যেন রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নয়, বরং ঋণগ্রহীতার প্রকৃত নগদ প্রবাহ ও পরিশোধ সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে হয়, এই নীতিতে ফিরে না গেলে আজকের তাড়াহুড়োর ঋণই আগামী দিনের নতুন খেলাপি ঋণে পরিণত হবে। চাহিদার দিক থেকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি। নির্ভরযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, নীতির ধারাবাহিকতা, উন্নত আইন-শৃঙ্খলা আর দ্রুত নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত হয়তো আরেকটি তারল্য ইনজেকশনের চেয়ে বেশি কাজে দেবে উৎপাদনশীল ঋণ ফিরিয়ে আনতে। আর সরকারকেও নিজের ঋণের কাঠামো নিয়ে ভাবতে হবে, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনা আর বন্ড বাজারকে গভীর করা গেলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর থেকে চাপ কমবে। আর ব্যাংকগুলো তাদের মূল কাজে, সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরে মনোযোগ দিতে পারবে। যতদিন না এই সক্ষমতা ফিরে আসছে, ততদিন এই বৈপরীত্যই থেকে যাবে: ব্যাংকে টাকা থাকবে, কিন্তু অর্থনীতির জন্য ঋণ থাকবে অপ্রতুল।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

