দেশের ব্যাংকিং খাতে এখন অর্থের সংকট নেই; বরং ব্যাংকগুলোতে জমছে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য। গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রেকর্ড ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এক মাস আগে মে মাসে এই পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে তলানিতে। জুন শেষে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা মে মাসে ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকে পড়ে থাকলেও শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতে সেই অর্থের প্রবাহ বাড়ছে না।
বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের সুদের সীমাও কমানো হয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও ব্যাংকঋণের সুদহারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। ফলে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ ফিরছে না।
ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকট এখন আর ব্যাংকে টাকার অভাব কিংবা শুধু সুদের হারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যবসায়িক আস্থার সংকট, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। নীতি সুদহার কমানোর ফলে ঋণের সুদ খুব বেশি কমবে বলে মনে হয় না। তাই শুধু নীতি সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়।
তার মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বাড়াতে হবে। চাহিদা না থাকলে ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও ঋণের চাহিদা তৈরি হবে না। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, চাঁদাবাজিসহ অনানুষ্ঠানিক বাধা দূর করা এবং পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য জমার আরেকটি কারণ হলো সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় এবং ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে ব্যাংকগুলো সরকারি বিল ও বন্ডে অর্থ রাখছে। এর সঙ্গে সরকারের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ায় তৈরি হচ্ছে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’। ফলে উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে যাওয়ার পরিবর্তে অর্থের বড় অংশ সরকারি খাতে প্রবাহিত হচ্ছে।
শিল্প খাতেও বিনিয়োগের পরিবেশ অনুকূল নয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয় ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। ফলে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় চলতি মূলধনের ঋণই বেশি নেওয়া হচ্ছে।
উদ্বৃত্ত তারল্য বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজার থেকে নিট ৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। এসব ডলার কেনার বিপরীতে সমপরিমাণ টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ করায় বাজারে তারল্য আরও বেড়েছে। পাশাপাশি আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি থাকলেও সেই অনুপাতে ঋণ বিতরণ না বাড়ায় ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত অর্থ জমেছে।
এদিকে অতীতে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ বিতরণের কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্ক। ঋণ আবেদনকারীর জামানত, ব্যবসার সক্ষমতা ও নগদ প্রবাহ কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। ফলে পর্যাপ্ত অর্থ হাতে থাকলেও ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি ঋণের বদলে তুলনামূলক নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
ব্যাংকগুলোতে তারল্য পর্যাপ্ত থাকায় আন্তব্যাংক বাজার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও স্বল্পমেয়াদি ঋণের প্রয়োজন কমেছে। কলমানি, আন্তব্যাংক রেপো ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর মোট ধার জুনে প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা থেকে জুলাইয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক মাসে ধার কমেছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে জুলাইয়ে কলমানি বাজারের টার্নওভার ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং আন্তব্যাংক রেপোর টার্নওভার ২০ দশমিক ৭২ শতাংশ কমেছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বড় গ্রাহকের ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং রেপো রেট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। ঋণের সুদহার নির্ধারণে স্প্রেড ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সুদহার কমানো বা নীতিগত ছাড় দিয়ে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় কমানো, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে ব্যাংকে জমে থাকা বিপুল তারল্য উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কাজে লাগানো কঠিন হবে।

