এক দশক আগেও বাংলাদেশের তরুণ সমাজের কাছে ‘ব্যাংকে চাকরি’ ছিল কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, মানবিক ও অন্যান্য বিভাগের স্নাতকদের মধ্যেও রাষ্ট্রায়ত্ত ও শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের অফিসার পদ নিয়ে ছিল প্রবল আগ্রহ। তুলনামূলক আকর্ষণীয় বেতন, করপোরেট পরিবেশ, সামাজিক মর্যাদা, ক্যারিয়ার অগ্রগতির সম্ভাবনা এবং চাকরির নিরাপত্তার ধারণা তরুণদের এ পেশার দিকে টেনে আনত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আকর্ষণের ধরন বদলেছে। ২০২৬ সালের বাস্তবতায় ব্যাংকিং পেশা এখনো দেশের শিক্ষিত তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হলেও এর পুরোনো আবেদন আর আগের মতো একমাত্রিক নয়। তরুণরা এখন শুধু বেতন বা চাকরির স্থায়িত্ব বিবেচনা করে ক্যারিয়ার নির্বাচন করছেন না; তাঁরা কর্মপরিবেশ, মানসিক সুস্থতা, ব্যক্তিজীবনের জন্য সময়, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর কাজ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—ব্যাংকের প্রবেশ পর্যায়ের পদে আবেদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে বা সব তরুণ ব্যাংকিং পেশা এড়িয়ে যাচ্ছেন, এমন সার্বজনীন ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং ভালো ব্যাংকের আকর্ষণীয় পদে এখনো প্রতিযোগিতা তীব্র। তবে কর্মজীবনে প্রবেশের পর অল্প সময়ের মধ্যে চাকরি পরিবর্তনের প্রবণতা, কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ এবং বিকল্প পেশার আকর্ষণ—এসব বিষয় ব্যাংকিং খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। ফলে প্রশ্নটি হওয়া উচিত, তরুণরা ব্যাংকিং থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কি না নয়; বরং ব্যাংকিং পেশার প্রচলিত কর্মসংস্কৃতি কি নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে?
বর্তমান কর্মবাজারে জেনারেশন জেড এবং তরুণ মিলেনিয়ালদের কাছে চাকরির নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই আর একমাত্র বিবেচনা নয়। কাজের স্বাধীনতা, দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ, মানসিক সুস্থতা, কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য এবং দ্রুত ক্যারিয়ার অগ্রগতি তাঁদের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রযুক্তির বিস্তার এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার, স্টার্টআপ, ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক রিমোট চাকরির মতো ক্ষেত্র তরুণদের সামনে প্রচলিত চাকরির বাইরে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট অফিসে দীর্ঘ সময় উপস্থিত থেকে একই ধরনের কাজ করার বিনিময়ে শুধু চাকরির নিরাপত্তা পাওয়া এখন অনেকের কাছে যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়।
তবে ব্যাংকিং পেশাকে ‘গৎবাঁধা কাজের পেশা’ হিসেবে পুরোপুরি দেখাও ঠিক হবে না। ডিজিটাল ব্যাংকিং, ফিনটেক, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কমপ্লায়েন্সের বিস্তারের কারণে ব্যাংকারের কাজও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে, সব ব্যাংক একই গতিতে এই রূপান্তর ঘটাতে পারছে না।
তরুণদের ব্যাংকবিমুখতার আলোচনায় মানসিক চাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের ব্যাংকারদের ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় উদ্বেগ, বিষণ্নতা, চাকরিজনিত চাপ এবং বার্নআউটের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৩৯৭ জন ব্যাংককর্মীর তথ্য বিশ্লেষণ করে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও স্ট্রেসের উচ্চমাত্রার উপসর্গ পাওয়া যায় এবং কর্মীদের একটি বড় অংশের মধ্যে বার্নআউটের লক্ষণ শনাক্ত হয়। গবেষণায় কর্মঘণ্টা, অফিসে অতিরিক্ত সময় থাকা, বেতন নিয়ে সন্তুষ্টি, কর্মজীবন-ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য এবং ক্যারিয়ার উন্নতির সুযোগের সঙ্গে কর্মীদের মানসিক অবস্থার সম্পর্কও উঠে আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি গবেষণাতেও ব্যাংকারদের কর্মদক্ষতার ওপর চাকরি-সংক্রান্ত ও সাংগঠনিক চাপের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং পরিবেশে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার পরও কাজ করা এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের বাস্তবতাও সেখানে আলোচিত হয়েছে।
এই চাপের অন্যতম উৎস হলো লক্ষ্যমাত্রা। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকে নতুন কর্মকর্তাদের আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, ঋণ আদায়, নতুন গ্রাহক সৃষ্টি কিংবা বিভিন্ন ব্যাংকিং পণ্য বিক্রির লক্ষ্য পূরণ করতে হয়। অর্থনীতিতে যখন মূল্যস্ফীতি বেশি, মানুষের সঞ্চয়ক্ষমতা চাপে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ অনিশ্চিত, তখন বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ লক্ষ্য কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
সমস্যা আরও বাড়ে যখন লক্ষ্য পূরণকে কর্মীর সামগ্রিক দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন নতুন কর্মকর্তা ব্যাংকিং কমপ্লায়েন্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকসেবা শেখার পর্যায়ে থাকতেই যদি কঠোর ব্যবসায়িক ফলাফলের চাপের মুখে পড়েন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পেশাটির প্রতি বিরূপ ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ব্যাংকের নির্ধারিত অফিস সময় থাকলেও বাস্তবে অনেক কর্মীর কাজ তার চেয়ে দীর্ঘ হয়। হিসাব সমন্বয়, ঋণসংক্রান্ত কাজ, রিপোর্ট তৈরি, অডিট, কমপ্লায়েন্স, গ্রাহকসেবা এবং দিনের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে অনেক কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের পরও অফিসে থাকেন। বিশেষ পরিস্থিতিতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও প্রশিক্ষণ, পুনরুদ্ধার কার্যক্রম বা সাংগঠনিক সভায় অংশ নিতে হয়।
একজন তরুণ কর্মী যদি নিয়মিতভাবে কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন এবং এর ফলে পরিবার, সামাজিক জীবন, বিশ্রাম বা ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য সময় না পান, তাহলে উচ্চ বেতনও একসময় পর্যাপ্ত প্রণোদনা হিসেবে কাজ নাও করতে পারে।
এখানেই নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পুরোনো কর্মসংস্কৃতির সংঘাত সবচেয়ে স্পষ্ট। আগের প্রজন্মের অনেকেই দীর্ঘ কর্মঘণ্টাকে ক্যারিয়ার তৈরির স্বাভাবিক মূল্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু বর্তমান তরুণরা প্রশ্ন তুলছেন—দক্ষতার সঙ্গে কাজ শেষ করার পরিবর্তে শুধু দীর্ঘ সময় অফিসে উপস্থিত থাকা কেন সাফল্যের মাপকাঠি হবে?
‘সুযোগের অভাব’ বলতে আসলে কী বোঝায়? ব্যাংকিং পেশায় সুযোগ নেই—এমন ধারণাও সরলীকৃত। ২০২৬ সালেও বিভিন্ন ব্যাংক ট্রেইনি অফিসার, ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণার্থী এবং প্রবেশ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিচ্ছে। কিছু ব্যাংকে নতুন স্নাতকদের জন্য যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক বেতনও রয়েছে। ফলে সমস্যা শুধু প্রবেশকালীন বেতনের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়।
প্রকৃত সমস্যা হলো বেতন, কাজের চাপ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার অগ্রগতির মধ্যে ভারসাম্য। উদাহরণ হিসেবে ২০২৬ সালের বিভিন্ন নিয়োগে দেখা যায়, কিছু বেসরকারি ব্যাংকে ট্রেইনি পর্যায়ে প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি বেতন দেওয়া হচ্ছে; ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণার্থী পর্যায়ে কিছু ব্যাংকের বেতন আরও বেশি। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতে ভালো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ের বেতন এখনো অনেক পেশার তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক।
কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ায় এই বেতনকে তরুণরা কাজের সামগ্রিক মূল্য দিয়ে বিচার করছেন। ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরে বাসা, যাতায়াত, খাবার ও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর হাতে কত থাকে এবং তার বিনিময়ে কত ঘণ্টা কাজ করতে হয়—এই হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, পদোন্নতির গতি এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একজন তরুণ যদি কয়েক বছর কাজ করার পরও নিজের পরবর্তী পদ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং সম্ভাব্য ক্যারিয়ার পথ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না পান, তাহলে অন্য খাতে যাওয়ার আগ্রহ বাড়তে পারে।
ক্যারিয়ার অগ্রগতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ব্যাংকিং পেশার আকর্ষণের অন্যতম ভিত্তি। কর্মী যদি বিশ্বাস করেন যে তাঁর কর্মদক্ষতা, দক্ষতা ও ফলাফলের ভিত্তিতে পদোন্নতি হবে, তাহলে কঠিন কর্মপরিবেশও অনেক ক্ষেত্রে সহনীয় হয়ে ওঠে।
কিন্তু যদি কর্মীদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, অনানুষ্ঠানিক প্রভাব কিংবা তোষামোদ পেশাগত দক্ষতার চেয়ে বেশি কার্যকর, তাহলে কর্মপ্রেরণা দ্রুত কমে যায়। ‘নেপোটিজম’ বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ কোনোভাবেই পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর আরোপ করা যায় না; তবে এ ধরনের অভিযোগের উপস্থিতিও প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য সতর্কবার্তা। তাই ব্যাংকগুলোতে পরিমাপযোগ্য ও স্বচ্ছ কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, নিয়মিত প্রতিক্রিয়া, দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা এবং স্পষ্ট পদোন্নতি কাঠামো থাকা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি ব্যাংকিং খাতকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াকরণ, ডিজিটাল পেমেন্ট, সাইবার নিরাপত্তা ও ফিনটেকের বিস্তার ব্যাংকের প্রচলিত কাজের ধরন পাল্টাচ্ছে। এ অবস্থায় একজন তরুণ কর্মকর্তাকে যদি দীর্ঘদিন শুধু নথিপত্র, ভাউচার, ডেটা এন্ট্রি বা রুটিন প্রশাসনিক কাজে আটকে রাখা হয়, তাহলে তাঁর দক্ষতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বরং ব্যাংকগুলোকে কর্মীদের তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল ব্যাংকিং, সাইবার ঝুঁকি, আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক গ্রাহকসেবার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এটি শুধু কর্মীদের সুবিধার জন্য নয়; ব্যাংকের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্যও প্রয়োজনীয়।
তরুণদের ব্যাংকিং পেশার প্রতি মনোভাবকে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং সংকট থেকে আলাদা করা যায় না। খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সমস্যা, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছায় এবং মোট ঋণের প্রায় ৩২.২৬ শতাংশ খেলাপি ছিল। জুনে খেলাপি ঋণ প্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশে পৌঁছায়। এই মাত্রার খেলাপি ঋণ ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি করে।
এমন পরিস্থিতিতে তরুণদের একটি অংশ ব্যাংকিং পেশার দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কোনো ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা, পুনর্গঠন বা একীভূতকরণের সম্ভাবনা থাকলে কর্মীরাও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন। তবে এ ক্ষেত্রেও পুরো ব্যাংকিং খাতকে এক কাতারে ফেলা ঠিক হবে না। শক্তিশালী, সুশাসিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকের কর্মপরিবেশ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এক নয়।
ডিজিটাল রূপান্তরের কারণে ব্যাংকের প্রচলিত কিছু কাজ কমে যেতে পারে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ধরনের কাজও তৈরি হচ্ছে। শাখাভিত্তিক রুটিন কাজের প্রয়োজন কমলেও ডেটা বিজ্ঞান, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল পণ্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কমপ্লায়েন্স, ফিনটেক এবং তথ্যনিরাপত্তায় দক্ষ মানুষের প্রয়োজন বাড়বে।
সুতরাং ব্যাংকিং পেশার ভবিষ্যৎকে ‘চাকরি থাকবে না’—এভাবে দেখার পরিবর্তে বলা উচিত, চাকরির প্রকৃতি বদলাবে। যে ব্যাংক কর্মীদের এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করবে, সেই ব্যাংকই দক্ষ তরুণদের ধরে রাখতে পারবে। কী করতে হবে?
প্রথমত, ব্যাংকগুলোকে কর্মঘণ্টা ও কর্মপরিবেশের বিষয়ে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘ সময় অফিসে থাকার সংস্কৃতি কমাতে হবে এবং অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে যথাযথ ক্ষতিপূরণ বা স্বীকৃতির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নতুন কর্মকর্তাদের ওপর যোগদানের শুরুতেই অতিরিক্ত ব্যবসায়িক লক্ষ্য চাপিয়ে না দিয়ে প্রথম পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, কমপ্লায়েন্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে বাজার পরিস্থিতি ও কর্মীর অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।
তৃতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্যকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার আনুষ্ঠানিক অংশ করতে হবে। প্রশিক্ষিত কাউন্সেলিং সুবিধা, গোপনীয় সহায়তা, মেন্টরশিপ এবং ব্যবস্থাপকদের জন্য কর্মীবান্ধব নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে।
চতুর্থত, পদোন্নতি ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। ডিজিটাল কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকলেও সেটিকে শুধু সংখ্যাভিত্তিক KPI-তে সীমাবদ্ধ না রেখে নেতৃত্ব, সততা, গ্রাহকসেবা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতা উন্নয়নকেও মূল্যায়নের অংশ করতে হবে।
পঞ্চমত, ব্যাংকের ব্যাক-অফিস ও প্রযুক্তিনির্ভর কিছু কার্যক্রমে প্রয়োজন অনুযায়ী নমনীয় বা হাইব্রিড কর্মপদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। শাখা কার্যক্রমে এটি সবসময় সম্ভব না হলেও তথ্যপ্রযুক্তি, বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার, গবেষণা ও কিছু প্রশাসনিক কাজে নমনীয়তা কর্মীদের সন্তুষ্টি বাড়াতে পারে।
সবশেষে, ব্যাংকিং খাতের মূল আর্থিক ও সুশাসনসংক্রান্ত দুর্বলতা দূর করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ অনুমোদনে শৃঙ্খলা, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীর আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। কারণ একটি দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, সেখানে কর্মরত তরুণদের ক্যারিয়ারের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
ব্যাংকিং পেশায় তরুণদের অনাগ্রহকে কেবল ‘তরুণরা পরিশ্রম করতে চায় না’—এই পুরোনো ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করা যাবে না। একইভাবে ‘ব্যাংকে এখন আর কোনো সুযোগ নেই’—এমন সিদ্ধান্তও বাস্তবসম্মত নয়। প্রকৃত সংকটটি আরও গভীরে।
একদিকে রয়েছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, লক্ষ্যমাত্রার চাপ, কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্যের অভাব এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর কর্মসংস্কৃতির অভিযোগ। অন্যদিকে রয়েছে সীমিত ক্যারিয়ার অগ্রগতি, দক্ষতা উন্নয়নের অসম সুযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ব্যবধান এবং ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক আর্থিক সংকট।
অন্যদিকে সুযোগও রয়েছে—বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ফিনটেক ও ডিজিটাল আর্থিক সেবায়। তাই ব্যাংকিং খাতের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই নতুন সুযোগগুলোকে তরুণদের জন্য দৃশ্যমান ও বাস্তব করা।
বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে দক্ষ মানবসম্পদের ওপর। তরুণ মেধাবীরা যদি ব্যাংকিং খাতকে কেবল অতিরিক্ত চাপ, অনিশ্চিত ক্যারিয়ার ও সীমিত স্বাধীনতার পেশা হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর জন্য দক্ষ জনবল ধরে রাখা কঠিন হবে।
সুতরাং তরুণদের ব্যাংকিং পেশায় ফিরিয়ে আনতে শুধু নিয়োগ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; ব্যাংকিং পেশাটিকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। এমন একটি কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে কর্মদক্ষতার মূল্য থাকবে, কাজের সময়ের মর্যাদা থাকবে, মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে এবং পদোন্নতির পথ হবে স্বচ্ছ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ‘মানসিক চাপ নাকি সুযোগের অভাব’—এমন দ্বৈততার মধ্যে আটকে নেই। মানসিক চাপ ও সুযোগের সংকট একে অপরকে শক্তিশালী করে। যখন কাজের চাপ বেশি কিন্তু ভবিষ্যৎ অগ্রগতির সম্ভাবনা অস্পষ্ট, তখন তরুণ কর্মী দ্রুত বিকল্প খুঁজবেন। আর যখন ব্যাংকিং পেশা দক্ষতা, মর্যাদা, ভারসাম্য ও উন্নতির বাস্তব সুযোগ দিতে পারবে, তখন এই পেশার পুরোনো আকর্ষণ নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত তাই আজ শুধু আর্থিক সংস্কারের নয়, মানবসম্পদ ও কর্মসংস্কৃতির সংস্কারেরও সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে॥

