খবরের কাগজ খুললেই মাঝে মাঝে চোখে পড়ে, সরকার ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা ঋণ নিচ্ছে। কখনো তা কয়েক হাজার কোটি, কখনো আবার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সংখ্যাগুলো এতটাই বিশাল যে সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনের সঙ্গে এর সম্পর্ক বোঝা সহজ হয় না। অথচ এই ঋণের সুতোয় জড়িয়ে আছে ব্যাংকিং খাত, বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, এমনকি আগামী দিনের সরকারি ব্যয়ের হিসাবও।
একজন সাধারণ মানুষ হয়তো বাড়ি বানাতে ব্যাংক থেকে ঋণ চান। কোনো উদ্যোক্তা চান কারখানার জন্য টাকা। কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে বা কর্মী নিয়োগ দিতে ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়। ঠিক একই সময়ে সরকারও ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা ধার করে। প্রশ্ন হলো—সরকার যখন ব্যাংকের টাকার বড় অংশ নিয়ে নেয়, তখন এর প্রভাব গিয়ে পড়ে কোথায়?
প্রতি বছর সরকারকে বহু খাতে অর্থ ব্যয় করতে হয়—কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো নির্মাণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ভর্তুকি, সব মিলিয়ে বিশাল অঙ্কের প্রয়োজন পড়ে। এই খরচের সিংহভাগ আসে করসহ অন্যান্য রাজস্ব থেকে। কিন্তু যে বছর আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়ে যায়, তখনই তৈরি হয় ঘাটতি। সেই ঘাটতি পূরণে সরকার দেশি-বিদেশি নানা উৎস থেকে ধার করে, আর দেশের অভ্যন্তরে ব্যাংক এক্ষেত্রে অন্যতম বড় ভরসা। এই ঋণ নেওয়ার প্রধান মাধ্যম হলো ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিক্রি—সরকার এসব ঋণপত্র বিক্রি করে ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ করে, পরে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সুদসহ তা ফিরিয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ের হিসাব দেখলে বোঝা যায়, এই ঋণের অঙ্ক কীভাবে বেড়ে চলেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, যা পরে সংশোধন করে এক লাখ আঠারো হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে প্রকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ পঁয়ষট্টি হাজার পাঁচশ কোটি টাকায়—অর্থাৎ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় সাতচল্লিশ হাজার পাঁচশ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে এক লাখ বারো হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যেখানে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় দুই লাখ তেতাল্লিশ হাজার কোটি টাকা।
এখন প্রশ্ন হলো, সরকার বেশি ঋণ নিলে সমস্যা কোথায়? মূল জটিলতা তৈরি হয় তখনই, যখন সরকার আর বেসরকারি খাত—দুই পক্ষই একসঙ্গে ব্যাংকের কাছে বড় অঙ্কের টাকা চায়। ধরা যাক, অনেক ব্যবসায়ী কারখানা সম্প্রসারণ বা নতুন যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঋণ খুঁজছেন, একই সময়ে সরকারও বিপুল অঙ্ক ধার করছে। তখন ব্যাংকের হাতে থাকা তহবিলের ওপর চাপ তৈরি হয়, যার ফলে বেসরকারি খাতের ঋণের সুদহার বেড়ে যেতে পারে, অথবা ঋণ পাওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থনীতির ভাষায় এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট’—অর্থাৎ সরকারের ঋণ নেওয়ার কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়া।
বাস্তব চিত্রেও এই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে সাড়ে চার শতাংশের নিচে, যা গত তেত্রিশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ত্রিশ শতাংশ। তবে এই তথ্যের অর্থ এই নয় যে শুধু সরকারের বেশি ঋণ নেওয়ার কারণেই বেসরকারি ঋণ কমেছে। ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে অনাগ্রহ, সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকগুলোর ঋণদানে বাড়তি সতর্কতাও এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন প্রধান অর্থনীতিবিদ এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, এখন যেহেতু বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা এমনিতেই কম, তাই সরকারের ঋণ নেওয়ার চাপ এখনই স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে না। তবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে এবং ব্যবসায়ীরা ফের বেশি ঋণ চাইতে শুরু করলে সরকারের বড় অঙ্কের ঋণ তখন সত্যিকার অর্থে বেসরকারি খাতের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে।
ব্যাংকগুলো কেন সরকারকে এত সহজে ঋণ দিতে রাজি হয়, তারও একটা ব্যাখ্যা আছে। সরকার ট্রেজারি বিল বা বন্ড বিক্রি করলে ব্যাংক তা কিনে নেয় এবং বিনিময়ে সুদ পায়। সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগকে ব্যাংকগুলো অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে করে, কারণ এখানে টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা অনেক বেশি। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ভালো মুনাফার সুযোগ থাকলে ব্যাংকগুলো ঝুঁকিহীন সরকারি সিকিউরিটিজেই বিনিয়োগ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে—আর এটিও বেসরকারি ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ঋণের বোঝা গিয়ে পড়ে কার ঘাড়ে? প্রাথমিকভাবে দায় তৈরি হয় সরকারের ওপর, তবে চূড়ান্ত বিচারে এর ভার বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকেই। কারণ, মানুষের দেওয়া করের টাকা দিয়েই সরকার ঋণ ও তার সুদ পরিশোধ করে। এই প্রভাব কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে মানুষের জীবনে পৌঁছায়। প্রথমত, ঋণের সুদহার বেড়ে গেলে ব্যবসা পরিচালনার খরচও বেড়ে যায়, যার ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়ে পড়তে পারে। ধরা যাক, কোনো উদ্যোক্তা দশ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে একটি কারখানা করতে চাইছেন—সুদহার বেশি হলে তার প্রকল্পের খরচও বেড়ে যাবে, ফলে তিনি হয়তো সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেবেন। অনেক উদ্যোক্তা একসঙ্গে এমন সিদ্ধান্ত নিলে সামগ্রিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতিতেই ভাটা পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, সরকার যে ঋণ নেয়, তার আসল ও সুদ ভবিষ্যতে পরিশোধ করতেই হয়। ঋণের পরিমাণ ও সুদের বোঝা বাড়তে থাকলে বাজেটের একটা বড় অংশ শুধু ঋণ পরিশোধেই ব্যয় হয়ে যায়, ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক খাত ও উন্নয়ন কাজে বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলক কমে আসে। একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার একজন গবেষণা পরিচালকের পর্যবেক্ষণ, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আয় না বাড়লে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, সরকারের বেশি ঋণ নেওয়া কি সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়? সরকার যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নিয়ে অর্থনীতিতে নতুন টাকা ছাড়ে, তাহলে সামগ্রিক চাহিদা বেড়ে যায়, আর এতে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে—কারণ বাজারে টাকার জোগান বাড়লেও পণ্য ও সেবার সরবরাহ একই থাকলে দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। তবে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ট্রেজারি বিল বা বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া সরাসরি নতুন টাকা ছাপানোর মতো বিষয় নয়। তাই সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়লেই যে সঙ্গে সঙ্গে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে, এমনটা সবসময় সত্য নয়।
তবে সরকারের ঋণ নেওয়াকে একেবারে খারাপ বলাও ঠিক নয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশের সরকারই বড় প্রকল্প বা প্রয়োজনীয় কাজের জন্য ঋণ নিয়ে থাকে। আসল প্রশ্ন হলো, সেই ঋণের টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং সরকার তা কীভাবে শোধ করবে। যদি ঋণের টাকায় এমন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ে, নতুন ব্যবসা গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়—তাহলে সেই ঋণ অর্থনীতির জন্যই কাজে লাগে। কিন্তু ঋণ যদি ক্রমাগত বাড়তেই থাকে, অথচ সরকারের আয় সেই হারে না বাড়ে, তাহলে একসময় শুধু পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করতেই বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়ে পড়ে। শেষ বিচারে, সরকার কী পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে, কোন শর্তে নিচ্ছে এবং সেই অর্থ প্রকৃতপক্ষে কোথায় খরচ হচ্ছে—এই বিষয়গুলোই নির্ধারণ করে দেয়, অর্থনীতির জন্য তা আশীর্বাদ হয়ে আসবে নাকি বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

