গাজার জনগণের জন্য একজন ধর্মপ্রচারকের প্রার্থনার একটি ভিডিও পোস্ট করার পর, ইসরায়েলের জেফাত অ্যাকাডেমিক কলেজের এক ফিলিস্তিনি ছাত্রী স্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং তার সমস্ত অ্যাকাডেমিক ক্রেডিট বাতিলের সম্মুখীন হন।
হাইফার টেকনিয়ন-ইসরায়েল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির আরেকজন ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীকে কুরআনের একটি আয়াত পোস্ট করার জন্য সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে- ইসরায়েলে আরব সংখ্যালঘুদের অধিকার বিষয়ক আইনি কেন্দ্র আদালার এই সপ্তাহের একটি প্রতিবেদনে নথিভুক্ত একটি ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক দমনপীড়নেরই প্রতিফলন এই স্বতন্ত্র ঘটনাগুলো।
প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সম্মুখীন ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদালাহ ১৩০টিরও বেশি আবেদন পেয়েছে। লক্ষ্যবস্তু হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে চারজনের মধ্যে তিনজনেরও বেশি ছিলেন নারী।
প্রতিবেদনে এই উপসংহার টানা হয়েছে যে, ইসরায়েলি শিক্ষামহল উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বর্ণবৈষম্যমূলক একটি দ্বি-স্তরীয় শৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে।
ফিলিস্তিনিরা একটি “প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার” মধ্য দিয়ে যায়, যার বৈশিষ্ট্য হলো প্রচলিত পদ্ধতিগত সুরক্ষা এবং নির্দোষিতার অনুমানের স্থগিতাদেশ।
অপরদিকে, ইহুদি ইসরায়েলিরা আইনের শাসনের উপর ভিত্তি করে “সাংবিধানিক পথ” সুরক্ষা পেয়ে থাকেন।
প্রাতিষ্ঠানিক অযোগ্যতা
প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের পর্যবেক্ষণে একাধিক পদ্ধতিগত ত্রুটি প্রকাশ পেয়েছে, বিশেষত আরবি লেখা, প্রার্থনা এবং সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি ব্যাখ্যা করার জন্য গুগল ট্রান্সলেটের মতো স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
আদালার অধিভুক্ত আইনজীবী, ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউটের পিএইচডি গবেষক এবং প্রতিবেদনটির সহ-লেখক আদি মনসুর বলেছেন, এটিকে একটি পরিকল্পিত কৌশল হিসেবে দেখা উচিত নয়।
“আমরা এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক অযোগ্যতা হিসেবে দেখি, যার সাথে যুক্ত হয়েছে ভাষা ও আলোচনার জটিলতা বুঝতে না চাওয়ার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জায়নবাদী ইসরায়েলি ইহুদি দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে থাকা কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত হতে না চাওয়ার অনিচ্ছা,” তিনি আল জাজিরাকে বলেন।
কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে ফিলিস্তিনিরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা আত্মপক্ষ সমর্থন তুলে ধরতে না পারে।
মনসুর বলেন, “এমনকি যেখানে প্রতিরক্ষা পক্ষের ভাষাবিদদের সামনে আনা হয়েছিল, সেখানেও তাদের মতামত নিয়মিতভাবে খারিজ বা অগ্রাহ্য করা হয়েছে।” “শিক্ষার্থীদের পরিচয়কে এতটাই স্পষ্টভাবে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল যে, একটি কমিটি এমনকি এও উল্লেখ করেছিল যে, গাজার শিশুদের সঙ্গে এক শিক্ষার্থীর একাত্মতাকে ‘আপত্তিকর হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে’ এবং সেই শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করেছিল যে সে কেন ইসরায়েলি শিশুদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে না।”
বিষয়ভিত্তিক প্রয়োগ
ঐতিহাসিকভাবে, ইসরায়েলের ছাত্র অধিকার আইনের ১৭ নং ধারা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ক্ষমতাকে শুধুমাত্র পড়াশোনা-সম্পর্কিত আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের জীবনের ওপর তাদের এখতিয়ার প্রসারিত করে । তারা “অনুপযুক্ত আচরণ” এবং “জনশান্তির ক্ষতি”-র মতো সর্বব্যাপী বিধান প্রয়োগ করে এবং আইনি সীমাগুলোকে “জনসংবেদনশীলতা” মূল্যায়নের পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করে।
“কমিটি ও ট্রাইব্যুনালগুলো এই ‘জনসাধারণের সংবেদনশীলতা’ এবং ‘যুক্তিবাদী ব্যক্তি’ বলতে কার্যকরভাবে ইহুদি ইসরায়েলি জনসাধারণ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতিকে বুঝিয়েছে,” মনসুর আল জাজিরাকে বলেন।
আবেগকে কার্যকরভাবে আইনি ক্ষমতায় পরিণত করে, যা বক্তব্যের বৈধতা ও অর্থ নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো কোন ধরনের বক্তব্য নিষিদ্ধ, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মনসুরের মতে, এই পদ্ধতির ফলে ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য শর্তসাপেক্ষ অন্তর্ভুক্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ।
“[ফিলিস্তিনিরা] ততক্ষণই শিক্ষার্থী থাকে, যতক্ষণ তাদের মতপ্রকাশ সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বাচ্ছন্দ্য দ্বারা নির্ধারিত সীমানার মধ্যে এবং বৃহত্তর ইহুদি-ইসরায়েলি আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে,” তিনি বলেন।
এদিকে, আদালার প্রতিবেদনে নথিভুক্ত করা হয়েছে যে, ইসরায়েলি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গাজায় ফিলিস্তিনি জনগণের নির্মূল ও গণহত্যার জন্য ইহুদি-ইসরায়েলি শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আহ্বানকে উপেক্ষা করেছে।
বুধবার টাইমস হায়ার এডুকেশনকে দেওয়া এক মন্তব্যে টেকনিয়ন বলেছে, প্রতিবেদনটি “ইসরায়েলি শিক্ষাঙ্গন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে হেয় প্রতিপন্ন করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ” এবং অভিযোগগুলোকে “ভিত্তিহীন” বলে আখ্যা দিয়েছে।
সংগ্রামী গণতন্ত্র
এই কঠোর পদক্ষেপগুলোকে ন্যায্যতা দিতে, জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ১৯৬৫ সালের ইয়ারডোর রায়ের শরণাপন্ন হয়েছিল, যা ছিল “জঙ্গি গণতন্ত্র” বিষয়ক একটি মতবাদ এবং মূলত সামরিক শাসনের সময়কালে অনুমিত অভ্যন্তরীণ শত্রুদের বিরুদ্ধে আইনের সুরক্ষা স্থগিত করার জন্য ব্যবহৃত হতো।
মনসুর ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই আইনি কৌশলটি ইসরায়েলি শিক্ষাঙ্গনে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে থাকা একটি বৃহত্তর ও গভীরভাবে প্রোথিত ব্যবস্থার অংশ।
মনসুর বলেন, “আমরা এটিকে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হিসেবে দেখার চেয়ে বরং একটি বিদ্যমান ব্যবস্থারই প্রকাশ হিসেবে দেখি, যে ব্যবস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ‘অন্য’, পঞ্চম বাহিনী বা অভ্যন্তরীণ শত্রু হিসেবে গণ্য করে আসছে, বিশেষ করে যখন তারা তাদের ফিলিস্তিনি পরিচয় বা জাতীয় আখ্যান প্রকাশ করে, অথবা এমন কোনো আলোচনায় অংশ নেয় যা সংখ্যাগরিষ্ঠ জায়নবাদী-ইহুদি-ইসরায়েলি দৃষ্টিকোণ থেকে অবৈধ বলে বিবেচিত হয়।”
তিনি বলেন, “[শিক্ষাজগৎ] এমন একটি ব্যবস্থার দৃশ্যমান ও অকাট্য প্রমাণ-নির্ভর অংশ, যা ইতিমধ্যেই সমান্তরালভাবে একাধিক ক্ষেত্র জুড়ে বিস্তৃত। এমন একটি ব্যবস্থা যা ক্রমাগত ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ফিলিস্তিনি পতাকার মতো রাজনৈতিক প্রতীকের বিভিন্ন দিককে শত্রুর চিহ্ন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।”
বৈশ্বিক জবাবদিহিতা
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে মনসুর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
“আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, যেকোনো অ্যাকাডেমিক অংশীদারিত্ব বা সহযোগিতার জন্য অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত হওয়া উচিত,” মনসুর আল জাজিরাকে বলেন।
আমাদের প্রতিবেদনে প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক আকারে প্রয়োগ করা একটি কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দমনপীড়ন স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়– এটি একটি নীতি, যা অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য আমরা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আহ্বান জানাচ্ছি।
মনসুর বলেছেন, সেই “প্রাতিষ্ঠানিক দমনপীড়ন” ইসরায়েলের যৌথ শিক্ষাঙ্গনকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে।
“প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমাদের সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি যে, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং এটি এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে,” তিনি উপসংহারে বলেন।
এর পরিণতি শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না: শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে কঠোর পরিস্থিতিতে আটক রাখা হয়েছিল। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের নিজেদের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিল।
- মোহাম্মদ মনসুর: আল জাজিরার সিনিয়র রিপোর্টার

