রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের আলোচনায় থাকা একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ব্যাংক খাতে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। জানা গেছে, স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে তিনি তৃতীয় বিভাগ পেয়েছিলেন, যা সরকারের বিদ্যমান নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী এমডি পদে নিয়োগের জন্য অযোগ্যতার কারণ হিসেবে বিবেচিত। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, চাকরি জীবনে পরবর্তীতে অর্জিত উচ্চতর ডিগ্রি কি শিক্ষাজীবনের শুরুর দিকের এই দুর্বল ফলকে আড়াল করতে পারে কিনা।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের হালনাগাদ নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, শিক্ষাজীবনের যে কোনো স্তরে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি থাকলে সেই কর্মকর্তা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদের জন্য বিবেচিত হতে পারবেন না। চলতি বছরের শুরুতে জারি করা একটি প্রজ্ঞাপনে এই শর্ত আরও সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সর্বনিম্ন জিপিএ এবং স্নাতক পর্যায়ে সর্বনিম্ন সিজিপিএর মানদণ্ডও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, বিদেশি ডিগ্রির ক্ষেত্রে সমতাকরণের বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার শিক্ষাজীবনের বিবরণ থেকে জানা যায়, ষাটের দশকের শেষে চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া এই কর্মকর্তা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো ফল করেন, তবে স্নাতক সম্মান পর্যায়ে তৃতীয় শ্রেণি পান। এরপর মাস্টার্সে দ্বিতীয় শ্রেণি অর্জন করে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে তিনি ব্যাংকিং পেশায় যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে তিনি একটি কৃষি উন্নয়নভিত্তিক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন এবং শীর্ষ নির্বাহী পদে নিয়োগের আলোচনায় রয়েছেন।
নীতিমালা-সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন কর্মকর্তার মূল একাডেমিক রেকর্ড ধরা হয় চাকরিতে প্রবেশের সময়কার শিক্ষাগত যোগ্যতাকেই। চাকরিজীবনে পরে অর্জিত অতিরিক্ত ডিগ্রি কর্মদক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হলেও তা আগের রেকর্ড পরিবর্তন করতে পারে না বলে তাঁরা মনে করেন। এখানেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন—নীতিমালায় ব্যবহৃত ‘শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে’ শব্দগুচ্ছের ব্যাখ্যা কীভাবে হবে, এবং একজনের ক্ষেত্রে এই শর্ত শিথিল হলে একই পরিস্থিতিতে থাকা অন্য কর্মকর্তারাও কি সমান সুযোগ দাবি করতে পারবেন।
একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার একজন ব্যাংক-বিশ্লেষক এই প্রসঙ্গে বলেন, গত দেড় দশকের বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ব্যাংক খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে নীতিমালা মেনে নিয়োগ দেওয়া জরুরি। তাঁর মতে, একটি ব্যাংকে নীতিমালা উপেক্ষা করে নিয়োগ হলে সেটি ভবিষ্যতে অন্য প্রতিষ্ঠানের জন্যও অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা কাম্য নয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের একজন সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, কারও পেশাগত যোগ্যতা নিরূপণে কেবল একটি পরীক্ষার ফলকে একমাত্র মানদণ্ড ধরা ঠিক নয়, তবে সরকারের নির্ধারিত বিধিমালা থাকলে তার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যুক্তি নেই। প্রয়োজনে বিধিমালাই সংশোধন করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, কারণ ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার এই মুহূর্তে সরকারের বড় অগ্রাধিকার এবং নিয়োগ সংক্রান্ত বিতর্ক সেই লক্ষ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এখতিয়ারে পড়ে এবং নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগ হবে বলে তাঁরা প্রত্যাশা করেন, এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি কোনো মন্তব্য নেই।
এই প্রতিবেদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো উত্তর দেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নীতিমালার কঠোর ও সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রয়োগ কতটা জরুরি, তা নতুন করে সামনে এনেছে। ব্যতিক্রম তৈরি হলে ভবিষ্যতে যোগ্যতাভিত্তিক প্রতিযোগিতার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

