স্মার্টফোনের পর্দায় ‘তাত্ক্ষণিক ঋণ’ এর মতো প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে কিছু মোবাইল অ্যাপ। উচ্চ সুদ আর ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদনহীন এসব মোবাইল অ্যাপের পেমেন্ট সেবা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ৩০টি অবৈধ অ্যাপের তালিকা প্রকাশ করেছে, যেগুলো আর্থিক প্রতারণা, তথ্য চুরি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।
কোন অ্যাপগুলো অবৈধ? তালিকায় রয়েছে কেওয়ানজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, ক্যাশ হোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডো, টাকা ক্যাশ লোন, বঙ্গোক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী, লোন হাট, টাকা নাও, সাথী লোন, পপ ক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন এবং টাকা ক্যাশ লোন। এই অ্যাপগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে।
শুধু অনুমোদনহীনতা নয়, এসব অ্যাপের কার্যকলাপ আরও ভয়াবহ। ব্যবহারকারীরা যখন অ্যাপ ডাউনলোড করেন, তখন অজান্তেই তাদের ফোনের কন্ট্যাক্ট নম্বর, ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ভিডিও এবং এসএমএসে প্রবেশাধিকার পেয়ে যায় এসব অ্যাপ। ঋণগ্রহীতা যখন উচ্চ সুদসহ ঋণ পরিশোধে অস্বীকৃতি জানান, তখন অ্যাপ পরিচালনাকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই সংবেদনশীল তথ্য ও ছবি প্রকাশের হুমকি দেন, এটাই হচ্ছে ব্ল্যাকমেইলের খেলা।
এই পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি কী? বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের চিঠিতে পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০২৪-এর ১৫(২) ধারা উল্লেখ করেছে, যা বলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো অনলাইন বা অফলাইন প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ সংগ্রহ, ঋণ প্রদান, অর্থ সংরক্ষণ বা আর্থিক লেনদেন করা যাবে না। যেহেতু চিহ্নিত অ্যাপগুলোর কার্যক্রম এই অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, তাই সেগুলো আইনের ৩৭(১) ধারার অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এমনকি এই অবৈধ লেনদেনে সহায়তা করা পেমেন্ট সেবা প্রদানকারীরাও অপরাধের সহযোগী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।
কাদের কী করতে হবে? বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট (পিএসএসডি) সব তফসিলি ব্যাংক, বিএফআইইউ, বিটিআরসি, লাইসেন্সপ্রাপ্ত পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি), মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী এবং ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবা নগদকে নির্দেশ দিয়েছে। এই অ্যাপগুলো পরিচালনাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পেমেন্ট সেবা তাৎক্ষণিক বন্ধ করতে হবে। আর আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে পিএসএসডিকে অবহিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হয় না; ঋণ দেয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠান। জনসচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি, কারণ বারবার সতর্ক করেও অনেক মানুষ প্রতারকদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন।

