দেশের ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তা বাড়ানো, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ বা এফএসএসপি-২ নামের পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০২৬ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে প্রকল্পটির মেয়াদ থাকবে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রায় পুরো অর্থই ব্যয় হবে প্রশিক্ষণ, পরামর্শক নিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, সফটওয়্যার ও ডেটাবেইস তৈরির মতো খাতে। ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক, আইসিটি সরঞ্জাম, কম্পিউটার সফটওয়্যার এবং ডেটাবেইসসহ ছয়টি খাতেই ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। যা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ।
প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের মধ্যে ১ হাজার ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা আসবে বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে। এই অর্থ দেবে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ)। বাকি ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে জোগান দেওয়া হবে। প্রকল্পে সরকারের সরাসরি অর্থায়ন বা জিওবি বরাদ্দ রাখা হয়নি।
আইসিটি সরঞ্জামেই ৭১২ কোটি টাকা
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনার জন্য। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭১১ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি যাবে শুধু আইসিটি সরঞ্জাম কেনায়।
এ ছাড়া কম্পিউটার সফটওয়্যার কেনায় ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং ডেটাবেইস তৈরিতে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী কেনায় আরও ১ কোটি ৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা এবং অফিস সরঞ্জাম ও আসবাব কেনার জন্যও অর্থ রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রকল্পের মূলধন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
প্রশিক্ষণ পাবেন ৩,৫৬৫ জন
ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা বাড়াতে প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭০ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।
এর মধ্যে প্রকল্পের বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৩ কোটি টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে।
পরামর্শক নিয়োগেও বড় অঙ্কের অর্থ রাখা হয়েছে। ব্যক্তি পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় হবে ২৯ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক নিয়োগের জন্য বরাদ্দ ৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।
অর্থাৎ দুই ধরনের পরামর্শক নিয়োগে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা। ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৫৩ জনমাস এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শকের জন্য ছয়টি চুক্তির সংস্থান রাখা হয়েছে।
রাজস্ব খাতে ব্যয় ১৮৮ কোটি টাকা
প্রকল্পের রাজস্ব খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৮ কোটি ২৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শকের পাশাপাশি সেমিনার ও সম্মেলনের জন্য প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
যানবাহন ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ইন্টারনেট, ফ্যাক্স ও টেলেক্স, কম্পিউটার সামগ্রী, মুদ্রণ, স্টেশনারি এবং মেরামতসহ বিভিন্ন খাতেও অর্থ বরাদ্দ রয়েছে।
তবে প্রকল্পের আওতায় নতুন গাড়ি কেনার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। জরুরি প্রয়োজন এবং প্রকল্পের তদারকির কাজে চুক্তিভিত্তিক গাড়ি ভাড়া করার সুযোগ রাখা হয়েছে। পরিবহনসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদনের বিষয়টিও প্রকল্প পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংকটই প্রকল্পের মূল কারণ
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটেই প্রকল্পটি নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে প্রকল্পের নথিতে।
নথিতে বলা হয়েছে, দেশের আর্থিক খাতে বর্তমানে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং পুরনো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা রয়েছে। এর ফলে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে কিছু ব্যাংক, যার মধ্যে সরকারি ও ইসলামী ব্যাংকও রয়েছে, তারল্য ও মূলধন সংকটে পড়েছে।
এ অবস্থায় ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে সহায়তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট জনবলের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আর্থিক খাতকে আরও স্থিতিশীল করার লক্ষ্যেই পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

