বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি আবারও ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই ঘাটতি ১৬ শতাংশ বা ৩০ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা বেড়ে ৩০ জুন পর্যন্ত ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতির এই বৃদ্ধি তাদের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি পুরো অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের ৩১ মার্চ তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে জুন শেষে এই ঘাটতি আরও বেড়ে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ব্যাংকগুলো সাধারণত তাদের পরিচালন মুনাফা থেকে শ্রেণিকৃত ও অশ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করে। সম্ভাব্য ঋণক্ষতি মোকাবিলায় এটি এক ধরনের আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। কোনো ব্যাংক প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হলে যে ঘাটতি তৈরি হয়, সেটিই প্রভিশন ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ঘাটতি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা এবং আমানতকারী ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ শ্রেণির ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ০ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্নমানের ঋণের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা ক্ষতিগ্রস্ত ঋণের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।
কিন্তু খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মুনাফায় চাপ থাকায় অনেক ব্যাংক এই বাধ্যবাধকতা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় বেশি বেড়েছে। জুন শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। ছয় মাস আগে যা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ৭৪ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে এই ঘাটতি ছিল ৭০ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।
তবে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এই সময়ে প্রভিশন উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে পেরেছে। তাদের প্রভিশন উদ্বৃত্ত ডিসেম্বর ২০২৫-এর ৩৩৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে জুন শেষে ৫৮০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী আর্থিক অবস্থা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কারণে এসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও কিছুটা উন্নত হয়েছে। জুন শেষে এসব ব্যাংকের প্রভিশন উদ্বৃত্ত ছিল ৪৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অথচ চলতি বছরের মার্চ শেষে তাদের ২২২ কোটি টাকা এবং গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ২০১ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ার কারণেই প্রভিশন ঘাটতিও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা হয়। জুন শেষে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক খাতে প্রভিশন পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। শ্রেণিকৃত ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ পুনরুদ্ধার ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে নতুন একটি বাজার তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। সংসদে ‘দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’ পাস হলে খেলাপি ঋণ কেনাবেচার জন্য আনুষ্ঠানিক বাজার গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন ওই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা।
এ ছাড়া ২০০৩ সালের অর্থঋণ আদালত আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী এবং নতুন দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনটি চলমান সংসদ অধিবেশনে জরুরি ভিত্তিতে উপস্থাপনের জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি আধা-সরকারি চিঠি পাঠিয়ে অর্থঋণ আদালত আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী এবং নতুন দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন পাসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, প্রভিশন ঘাটতি বাড়তে থাকা ব্যাংক খাতের একটি কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন। এর পেছনে ব্যাংক খাতে দুর্নীতি, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত তদারকি এবং নিয়ন্ত্রক ছাড়ের মতো বিষয় রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে প্রভিশন ঘাটতি আরও বাড়বে। এতে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি পুরো অর্থনীতিতে ঝুঁকিও বাড়তে থাকবে।

