দেশের ব্যাংক খাতে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ এখন ছয় লাখ কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে হাতে গোনা কয়েকটি ব্যাংকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের শীর্ষ দশটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় চার লাখ ঊনচল্লিশ হাজার কোটি টাকায়।
এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে একটি শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় আটানব্বই হাজার নয়শ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণ পঁচাত্তর হাজার সাতশ কোটি টাকার বেশি। তৃতীয় অবস্থানে থাকা আরেকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ষাট হাজার ছয়শ কোটি টাকার কাছাকাছি।
এই তিনটি ব্যাংক মিলিয়েই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা—যা শীর্ষ দশ ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় সাড়ে তিপ্পান্ন শতাংশ। অর্থাৎ সংকটের এক বড় অংশই সীমাবদ্ধ রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে।
শীর্ষে থাকা ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ গত বছরের শেষভাগেও ছিল চুরানব্বই হাজার তিনশ কোটি টাকার কাছাকাছি, যা তখনই দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একক কোনো ব্যাংকের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই অঙ্ক আরও বেড়ে বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সময়ে ব্যাংকটির তারল্য সংকটও তীব্র আকার ধারণ করে, যার প্রেক্ষিতে গত জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক দফায় সহায়তা দিতে বাধ্য হয়—এমনকি টানা তিন দিনে মোট সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তাও দেওয়া হয় ব্যাংকটিকে।
শীর্ষ দশের বাকি তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে আটত্রিশ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ নিয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংক, বত্রিশ হাজার কোটির বেশি নিয়ে আরেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, প্রায় ঊনত্রিশ হাজার আটশ কোটি টাকা নিয়ে একটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, সাড়ে আটাশ হাজার কোটির বেশি নিয়ে আরেকটি বেসরকারি ব্যাংক, আটাশ হাজারের কিছু বেশি নিয়ে একটি প্রথাগত বাণিজ্যিক ব্যাংক, সাতাশ হাজারের বেশি নিয়ে আরেকটি ব্যাংক এবং সবশেষে বিশ হাজার তিনশ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ নিয়ে আরও একটি ব্যাংক।
কেবল শীর্ষ কয়েকটি ব্যাংক নয়, সামগ্রিকভাবেই দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চিত্র উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ছয় হাজার পাঁচশ পঞ্চান্ন কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় সাড়ে বত্রিশ শতাংশ। মার্চের তুলনায় মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সতেরো হাজার আটশ কোটি টাকার বেশি, যা প্রবৃদ্ধির গতি সম্পর্কেও একটি স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যাংকে এভাবে খেলাপি ঋণের কেন্দ্রীভবন ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা, বড় গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং ঋণের অর্থ ব্যবহার ও আদায় ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরছে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের একজন সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেন, কারা কী প্রক্রিয়ায় ঋণ নিয়েছেন, কোন জামানতের বিপরীতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে এবং সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় ব্যবহৃত হয়েছে—এসব বিষয় গভীরভাবে খতিয়ে দেখা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। তার মতে, খেলাপি ঋণ এভাবে বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকট আরও তীব্র হবে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে সাধারণ আমানতকারী, ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর।

