পুনর্মূল্যায়নের পর পাঁচ করবর্ষের বিপরীতে ৬০০ কোটির বেশি টাকা প্রদেয় কর দাবি নিয়ে কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি রিট খারিজ করেছেন হাইকোর্ট। এর ফলে কর কমিশনারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকল।
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন।
গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
এর আগে গ্রামীণ কল্যাণের করা ওই দুটি রিট খারিজ করে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রায় ঘোষণা করেছিলেন হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ। পরে একই বছরের ২৯ আগস্ট ওই রায় প্রত্যাহার করা হয়।
রায় প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে বলা হয়, ওই দ্বৈত বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারক একসময় এসব মামলায় সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। যেহেতু তিনি আগে মামলাগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাই ওই রায়কে ত্রুটিপূর্ণ বা ডিফেক্টিভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এরপর মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি মামলাগুলো বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন দ্বৈত বেঞ্চে পাঠান। পরবর্তী সময়ে শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করা হয়।
আদালতে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, সরদার জিন্নাত আলী ও আবদুল্লাহ আল মামুন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ বলেন, পাঁচ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা অনাদায়ি কর ছিল। প্রদেয় কর দাবি নিয়ে কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানটি দুটি রিট করেছিল।
তিনি বলেন, রিট দুটির চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত রুল ডিসচার্জ বা রুল খারিজ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ এখন গ্রামীণ কল্যাণকে সরকারের রাজস্ব হিসেবে প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।
তিনি আরও জানান, রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর ট্যাক্স বিভাগ ৩০ দিনের সময় দিয়ে কর আদায়ের জন্য ডিমান্ড নোটিশ জারি করবে।
তবে গ্রামীণ কল্যাণের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি দুটি রিট করেছিল। আদালত রুল খারিজ করে রায় দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে। পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার পর আপিল করা হবে।
পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে প্রদেয় কর দাবি করা হয়। এ দাবির বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি পৃথক দুটি রিট করে।
প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করেন। পরে চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণসহ রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেন।
ওই রায়ে কর কমিশনারের আদেশ বাতিল করা হয়েছিল। একই সঙ্গে বিলম্ব মার্জনা করে শর্তসাপেক্ষে আইন অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে গ্রামীণ কল্যাণকে আপিল করার সুযোগ দেওয়া হয়।
অতিরিক্ত কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করার সুযোগের কথাও ওই রায়ে উল্লেখ করা হয়।
হাইকোর্টের সেই রায়ের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পৃথকভাবে লিভ টু আপিল করে। আপিল করার অনুমতি চেয়ে করা ওই আবেদন নিষ্পত্তি করে আপিল বিভাগ ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আদেশ দেন।
আপিল বিভাগের আদেশে গ্রামীণ কল্যাণের করা রিটের মূল বিষয়বস্তুর ওপর হাইকোর্টে পুনরায় শুনানির নির্দেশ দেওয়া হয়।
পুনঃশুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট প্রথমে রিট দুটি খারিজ করে আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। পরে ওই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বর্তমান রায় প্রদানকারী বেঞ্চে পাঠান। সেই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট রিট দুটি খারিজ করে রায় ঘোষণা করেন।

