বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের চাপের প্রভাব পড়েছে টেকসই অর্থায়নেও। ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও নতুন করে অর্থায়নের আগ্রহ কমে যাওয়ায় চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর টেকসই অর্থায়ন আগের প্রান্তিকের তুলনায় কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংকগুলো মোট ৯২ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা টেকসই অর্থায়ন করেছে। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এর পরিমাণ ছিল ৯৭ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে টেকসই অর্থায়ন কমেছে ৪ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা।
তবে আগের বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের ৮১ হাজার ১২৫ কোটি টাকার তুলনায় সর্বশেষ প্রান্তিকে টেকসই অর্থায়ন বেশি ছিল।
ব্যাংকের বিপরীত চিত্র দেখা গেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে। এপ্রিল-জুন সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান ৩ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা টেকসই অর্থায়ন করেছে, যা জানুয়ারি-মার্চে ছিল ২ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে এ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬২১ কোটি টাকা।
পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের মতো খাতে দেওয়া অর্থায়নকে সবুজ অর্থায়ন বলা হয়। সামগ্রিক টেকসই অর্থায়ন কমলেও এই খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান—দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানেই অর্থায়ন বেড়েছে।
এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ব্যাংকগুলো সবুজ খাতে ৫ হাজার ১০৪ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে। জানুয়ারি-মার্চে এর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। তবে ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর সবুজ অর্থায়ন ছিল ৫ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবুজ অর্থায়ন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আগের প্রান্তিকের ৫৩৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এপ্রিল-জুনে তা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকায়।
টেকসই অর্থায়নের আওতায় রয়েছে সবুজ অর্থায়ন, টেকসই কৃষি, টেকসই ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়ন, টেকসইতার সঙ্গে যুক্ত সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল অর্থায়ন এবং অন্যান্য টেকসই ঋণ।
এ ধরনের অর্থায়নের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ছিল অন্যান্য টেকসই অর্থায়নের। মোট অর্থায়নের ৪০ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে। এরপর ৩৬ শতাংশ ছিল টেকসই ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়ন, প্রায় ১০ শতাংশ টেকসই কৃষিতে, ৭ শতাংশ টেকসইতার সঙ্গে যুক্ত সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল অর্থায়নে এবং ৬ শতাংশ সবুজ অর্থায়নে।
ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন কমেছে এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসই অর্থায়নের জন্য আলাদা ইউনিট গঠন এবং নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ বিতরণের ৩০ দশমিক ৯৮ শতাংশ ছিল টেকসই অর্থায়ন। একই সময়ে মেয়াদি ঋণ বিতরণের ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ ছিল সবুজ অর্থায়ন।
জুনের শেষে ব্যাংকগুলোর টেকসই অর্থায়নের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংকগুলো টেকসই অর্থায়নের ঋণ থেকে ৬৭ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা আদায় করেছে। একই সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আদায় করেছে ২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।
তবে ঋণ পরিশোধে চাপেরও ইঙ্গিত মিলেছে। এই প্রান্তিকে ব্যাংকগুলো ৩ হাজার ২১২ কোটি টাকার টেকসই অর্থায়নের ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃতফসিল করেছে ২৬ কোটি টাকা।
সবুজ অর্থায়নে ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৪১টি এবং ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ছিল। অন্যদিকে টেকসই অর্থায়নে ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ৫৬টি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১টি।
পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি মূল্যায়নও অব্যাহত রেখেছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এপ্রিল-জুন সময়ে ৪৬টি ব্যাংক ও ১৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ২ লাখ ৭ হাজার ২৯৯টি প্রকল্পের ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৩টি প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।
এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের জলবায়ু ঝুঁকি তহবিল থেকে আটটি প্রকল্প ও চারটি অনুষ্ঠানে অর্থায়ন করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে মোট ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় ১১৮টি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ২৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
সবুজ রূপান্তর তহবিলের দেশীয় মুদ্রা ব্যবস্থার আওতায় ১৪টি ব্যাংকের মাধ্যমে ২৩ জন গ্রাহককে ৪৯৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন তহবিল থেকে ছয়টি প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে ৬১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালের ডিসেম্বরে টেকসই অর্থায়ন নীতি চালু করে। পরে ২০২৩ সালে নীতিটি সংশোধন করে সবুজ ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল অর্থায়নের পরিধি আরও বাড়ানো হয়।

