Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice সোম, সেপ্টে. 14, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • জলবায়ু ও পরিবেশ
      • লাইফস্টাইল
      • বিশ্লেষণ
      • বিশেষ বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » খেলাপি ঋণ ও অর্থনীতি: সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
    সম্পাদকীয়

    খেলাপি ঋণ ও অর্থনীতি: সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?

    নিউজ ডেস্কসেপ্টেম্বর 13, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সংকটগুলোর মধ্যে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ এখন অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। এটি শুধু ব্যাংকের আর্থিক হিসাবের একটি সমস্যা নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, আমানতকারীর নিরাপত্তা, সরকারের আর্থিক চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ পুনঃতফসিলের অতিরিক্ত সুযোগ এবং অর্থ পাচারের মতো ঘটনায় সমস্যাটি ক্রমেই জটিল হয়েছে।

    সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনীতির চাপ এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে ব্যাংকিং খাতের পুরোনো সমস্যাগুলো এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে ব্যাংকের অর্থ আটকে যায়, নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও দেশের প্রবৃদ্ধির ওপর।

    তাই এখন প্রশ্ন শুধু খেলাপি ঋণ কত টাকা—তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, এই সংকট কীভাবে তৈরি হলো এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত কোন পথে বাংলাদেশ এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।

    বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রান্তিকের পরিসংখ্যান দেখলে সংকটের গভীরতা এবং এর ওঠানামা—দুটিই স্পষ্ট হয়।

    ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৩৬ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। এটি ছিল ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের এক নজিরবিহীন উচ্চতা। তবে বছরের শেষ প্রান্তিকে এসে পরিস্থিতির চিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হয়।

    ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা, মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ এবং হিসাবপদ্ধতিতে পরিবর্তনের ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক ধাক্কায় প্রায় ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে যায়। এর ফলে ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের অনুপাত সাময়িকভাবে নেমে আসে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে।

    তবে এই সাময়িক পতনকে ব্যাংক খাতের মৌলিক উন্নতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ঋণ পুনঃতফসিল বা হিসাবপদ্ধতির পরিবর্তনের ফলে কোনো ঋণ আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপির তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলেও তাতে ব্যাংকের হাতে প্রকৃত অর্থ ফেরত এসেছে—এমনটা সব ক্ষেত্রে নয়। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি মূল্যায়নে শুধু পরিসংখ্যানের ওঠানামা নয়, ঋণের প্রকৃত আদায়যোগ্যতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

    এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে।

    খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশ কয়েকটি ব্যাংকের কাছেই কেন্দ্রীভূত। দেশের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে, প্রায় ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা।

    রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

    খেলাপি ঋণের এই বড় অঙ্কের পেছনে ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ঋণ শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে আরও কঠোর আন্তর্জাতিক নীতিমালা কার্যকর করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় কোনো ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ের পর তিন মাসের মধ্যে পরিশোধ না হলে সেটিকে খেলাপি হিসেবে গণ্য করার বিধান কার্যকর হয়েছে। ফলে আগে যেসব ঋণ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময় পর খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতো, সেগুলোর একটি বড় অংশ এখন দ্রুত আনুষ্ঠানিক খেলাপি ঋণের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

    তাই সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে খেলাপি ঋণের যে ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তার একটি অংশ ব্যাংকগুলোর ঋণ পরিস্থিতির প্রকৃত অবনতির প্রতিফলন; অন্যদিকে নতুন ও কঠোর শ্রেণীকরণ পদ্ধতির কারণেও আনুষ্ঠানিক হিসাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হওয়া নিঃসন্দেহে দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। অর্থাৎ সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ব্যাংকের নয়; এটি এখন আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট।

    যে কারণে তৈরি হয়েছে খেলাপি ঋণের পাহাড়। বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতা একত্র হয়ে আজকের সংকট তৈরি করেছে। এর অন্যতম কারণ রাজনৈতিক প্রভাব। দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কখনো কখনো ঋণগ্রহীতার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এ ধরনের সম্পর্কনির্ভর সুবিধাকে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা সুবিধাভোগী পুঁজিবাদ বলা হয়।

    আরেকটি বড় সমস্যা হলো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংস্কৃতি। এমন অনেক ঋণগ্রহীতা রয়েছেন, যাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা অর্থ ফেরত দেননি। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা এবং প্রভাবশালী মহলের সহায়তার কারণে অনেকেই বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করেও ব্যবসা চালিয়ে যেতে পেরেছেন। এতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ব্যবসায়ীরাও এক ধরনের বৈষম্যের মুখে পড়েছেন।

    ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগও সমস্যাটিকে দীর্ঘায়িত করেছে। কোনো ব্যবসা সাময়িক সমস্যায় পড়লে তাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু বারবার এবং অতিরিক্ত সহজ শর্তে পুনঃতফসিলের সুযোগ দিলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল হয়। কাগজে ঋণটি নিয়মিত দেখা গেলেও ব্যাংকের হাতে প্রকৃত অর্থ ফেরত আসে না। ফলে ব্যাংকের নগদ প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে।

    অর্থ পাচারও এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ঋণের অর্থের একটি অংশ আমদানির নামে অতিমূল্য দেখানো, ভুয়া লেনদেন কিংবা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো অর্থ একবার দেশের বাইরে চলে গেলে তা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

    এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল বিচারিক প্রক্রিয়া। অর্থঋণ আদালতে বিপুলসংখ্যক মামলা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকায় ব্যাংকগুলো দ্রুত অর্থ উদ্ধার করতে পারছে না। মামলার দীর্ঘসূত্রতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং বিভিন্ন পর্যায়ে স্থগিতাদেশ পাওয়ার সুযোগ ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়াকে আরও ধীর করে দিয়েছে।

    খেলাপি ঋণের প্রভাব শুধু ব্যাংকে সীমাবদ্ধ নয়। খেলাপি ঋণের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে ব্যাংকের তারল্যের ওপর। ঋণ হিসেবে বিতরণ করা অর্থ সময়মতো ফিরে না এলে ব্যাংকের হাতে নতুন করে বিনিয়োগ বা ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ কমে যায়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যাংককে প্রভিশন রাখতে হয়। এতে ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধন—দুটোর ওপরই চাপ সৃষ্টি হয়।

    এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ভালো ঋণগ্রহীতাদের ওপরও। ব্যাংকের অর্থের ঘাটতি ও তহবিল সংগ্রহের ব্যয় বেড়ে গেলে ঋণের সুদের হারও বাড়তে পারে। ফলে যেসব উদ্যোক্তা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করেন, তারাও বেশি খরচে ঋণ নিতে বাধ্য হন। নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান তৈরির আগ্রহ কমে যায়।

    এভাবে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হয়। ঋণ আদায় কমে গেলে ব্যাংকের তারল্য সংকট দেখা দেয়; তহবিলের ব্যয় বাড়ে; ঋণের খরচ বাড়ে; বেসরকারি বিনিয়োগ কমে; নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়ে।

    রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দুর্বলতা সরকারের ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ বা আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সরকারি অর্থ ব্যবহার করতে হলে শেষ পর্যন্ত এর বোঝা জনগণের ওপর পড়ে। অর্থাৎ ব্যাংকের অনিয়মের ক্ষতি পরোক্ষভাবে করদাতাকে বহন করতে হয়। এই অর্থ অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো বা সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে ব্যয় করা যেত।

    উচ্চ খেলাপি ঋণ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলো একটি দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিবেচনায় নেয়। ব্যাংক খাতে ঝুঁকি বাড়লে বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ, বাণিজ্যিক ঋণ এবং বৈদেশিক লেনদেনের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।

    সংকট থেকে বের হতে হলে কী করতে হবে? বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু পুরোনো পদ্ধতিতে কাজ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। প্রয়োজন একই সঙ্গে কঠোরতা, স্বচ্ছতা এবং বাস্তব ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা।

    প্রথমেই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের আলাদা করে শনাক্ত করতে হবে। যে ব্যবসায়ী প্রকৃত ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে সাময়িকভাবে ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না এবং যে ব্যক্তি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করছেন না—তাদের একইভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

    ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বড় সরকারি চুক্তি, নতুন কোম্পানি গঠন বা নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনসম্মত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। তবে পাসপোর্ট বাতিল, বিদেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ জব্দের মতো পদক্ষেপ অবশ্যই আদালতের আদেশ ও প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে করতে হবে। লক্ষ্য হতে হবে শাস্তি নয়, ঋণের অর্থ পুনরুদ্ধার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

    স্বাধীন ব্যাংকিং সংস্কার কাঠামো প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত করতে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন আর্থিক খাত সংস্কার কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। এর অধীনে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাই, বড় ঋণের ফরেনসিক নিরীক্ষা এবং দুর্বল ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যেতে পারে।

    যেসব ব্যাংক কার্যত টিকে থাকার সক্ষমতা হারিয়েছে, তাদের শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা দীর্ঘমেয়াদে সমাধান নয়। প্রয়োজনে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণ, পুনর্গঠন অথবা নিয়ন্ত্রিত অবসায়নের ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু চাপ তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়তে পারে।

    একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবারতন্ত্র ও স্বার্থের সংঘাত কমাতে হবে। এক পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা ও মেয়াদ সীমিত করার মতো নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করা দরকার। ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে যথাযথ দূরত্ব নিশ্চিত না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন।

    খেলাপি ঋণের বিশাল বোঝা থেকে ব্যাংকের ব্যালান্সশিটকে আলাদা করার জন্য ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ বা এএমসি একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ধরনের দুর্বল বা অকার্যকর ঋণ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তর করা হবে। প্রতিষ্ঠানটি আইনি ও বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বন্ধকি সম্পদ বিক্রি বা অন্য উপায়ে অর্থ উদ্ধার করবে।

    মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আর্থিক সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের সম্পদ ব্যবস্থাপনা কাঠামো ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশও নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী এমন ব্যবস্থা বিবেচনা করতে পারে। তবে এএমসি কোনো ‘খারাপ ঋণ লুকানোর’ ব্যবস্থা হওয়া উচিত নয়। ঋণের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, সম্পদ হস্তান্তরের স্বচ্ছতা এবং উদ্ধার করা অর্থের হিসাব প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

    দ্রুত বিচার ও সম্পদ উদ্ধারের ব্যবস্থা। খেলাপি ঋণ আদায়ে বিচারব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থঋণ আদালতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচারক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ানো এবং প্রযুক্তির ব্যবহার করে মামলা ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা দরকার।

    ঋণসংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে অযথা দীর্ঘসূত্রতা কমানোর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক বিচারব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে বড় আর্থিক মামলার জন্য বিশেষায়িত দ্রুত বিচার কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। তবে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে কোনো পক্ষের ন্যায্য আইনি অধিকার খর্ব করা যাবে না। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতার প্রকৃত সম্পদ শনাক্তকরণ জরুরি। ভূমি, কোম্পানি, কর ও ব্যাংকিং তথ্যের মধ্যে আইনসম্মত সমন্বয় তৈরি হলে সম্পদ গোপন বা স্থানান্তরের সুযোগ কমবে।

    প্রযুক্তিই হতে পারে প্রতিরোধের নতুন হাতিয়ার। ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বড় তথ্যভান্ডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঋণ অনুমোদনের আগে একজন গ্রাহকের আগের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস, ব্যবসার নগদ প্রবাহ, কর-সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য বৈধ আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকি নির্ধারণ করা সম্ভব।

    বিশেষ করে বড় ঋণের ক্ষেত্রে শুধু জামানত দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ব্যবসার প্রকৃত নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ঋণ দেওয়ার পরও প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি চালানো যেতে পারে। এতে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার অবনতি শুরু হলে ব্যাংক আগেই সতর্ক হতে পারবে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্তের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

    কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি। ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে পেশাগত দক্ষতা, সততা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তদারকির ক্ষেত্রে কোনো ব্যাংক বা প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার পরিচয় যেন নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তদারকি ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করতে হবে। শুধু নিয়ম তৈরি করলেই হবে না; নিয়ম ভঙ্গ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।

    পুনঃতফসিলের নীতিতে ভারসাম্য দরকার। সব ঋণগ্রহীতাকে একসঙ্গে কঠোরভাবে চাপ দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। অনেক ব্যবসা প্রকৃতপক্ষে বাজার পরিস্থিতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি বা অন্য কোনো সাময়িক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের সুযোগ দিলে তারা আবার উৎপাদনে ফিরে এসে ঋণ পরিশোধ করতে পারে।

    তবে এই সুযোগ হতে হবে সীমিত, এককালীন এবং কঠোর শর্তযুক্ত। ঋণগ্রহীতার প্রকৃত ব্যবসা, সম্পদ, নগদ প্রবাহ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই না করে পুনঃতফসিল করা যাবে না। একই ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করে সমস্যাকে ভবিষ্যতের জন্য ঠেলে দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

    জনগণের অর্থে ব্যাংক রক্ষার সীমা কোথায়? ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনা বা অনিয়মের ক্ষতি বারবার জনগণের অর্থ দিয়ে পূরণ করা দীর্ঘমেয়াদে ন্যায়সংগত নয়।

    কোনো ব্যাংককে সরকারি সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন হলে তার সঙ্গে মালিক ও পরিচালকদের জবাবদিহি, ব্যবস্থাপনা সংস্কার, সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ সুশাসনের শর্ত যুক্ত করতে হবে। ব্যাংকের মালিক ও পরিচালকদের ভুল বা অনিয়মের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায় নির্ধারণ না করে শুধু জনগণের অর্থ দিয়ে ঘাটতি পূরণ করা হলে ভবিষ্যতেও একই সংস্কৃতি ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে।

    খেলাপি ঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এমন একটি সংকট, যা আর সাময়িক নীতি দিয়ে সামলানো সম্ভব নয়। বহু বছরের জমে থাকা অনিয়ম এখন ব্যাংকের তারল্য, মূলধন, বিনিয়োগ ও জনগণের আস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে ব্যাংকিং খাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর অর্থনীতিতে পৌঁছেছে।

    তবে সংকট যত বড়ই হোক, সঠিক সংস্কারের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা সম্ভব। এজন্য প্রথমে দরকার ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা। এরপর বড় ঋণগুলোর স্বাধীন নিরীক্ষা, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, দ্রুত ঋণ আদায় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা শক্তিশালী করতে হবে।

    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভালো ঋণগ্রহীতা ও ইচ্ছাকৃত খেলাপির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা। ব্যবসায়িক ঝুঁকির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাকে পুনরায় দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া যেমন দরকার, তেমনি অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

    বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার আর কেবল আর্থিক খাতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

    দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাকে পুনঃতফসিল, ছাড় বা সাময়িক তারল্য সহায়তার মাধ্যমে আড়াল করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকৃত ঋণ পরিস্থিতি প্রকাশ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকির মাধ্যমে একটি নতুন ব্যাংকিং সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

    কারণ শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানো নয়; নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরির পথ বন্ধ করা। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে, উৎপাদনশীল বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে অর্থের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসবে। আর সেই কারণেই খেলাপি ঋণ সংকটের সমাধান এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত।

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    অর্থনীতি

    ভারতকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র

    সেপ্টেম্বর 13, 2026
    অর্থনীতি

    দুই মাসে বেনাপোল দিয়ে সাড়ে ৩ লাখ কেজি ভারতীয় ইলিশ আমদানি

    সেপ্টেম্বর 13, 2026
    অর্থনীতি

    বড় বাজারগুলোতে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি, দুই মাসে আয় ৭৫০ কোটি ডলার

    সেপ্টেম্বর 13, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.