রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকে নীতিমালা লঙ্ঘন করে দেওয়া বাড়তি উৎসাহ বোনাসের অর্থ ফেরত আনার বিষয়টি দীর্ঘ দেড় বছরেও সুরাহা হয়নি। ২০২৩ সালের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনা পরিশোধ করা হলেও নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে অতিরিক্ত দুটি বোনাসের প্রায় ১১৬ কোটি টাকা এখন কর্মীদের কাছ থেকে ফেরত আনার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঠিক পরপরই। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিনের মাথায় সোনালী ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল করিমকে দপ্তরে অবরুদ্ধ করে বছরে পাঁচটি বোনাসের দাবি তোলেন। যদিও নিয়ম অনুযায়ী এই সুযোগ ছিল না, তবু চাপের মুখে তখনকার চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ নীতিবহির্ভূতভাবে পাঁচ বোনাসের প্রস্তাব অনুমোদন করে। এই সিদ্ধান্তের জেরে একদিকে নিরীক্ষা আপত্তি ওঠে, অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকও বিষয়টিতে সায় দেয়নি। আন্দোলনের চাপ এমন পর্যায়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন চেয়ারম্যান নিজেই।
এরপর প্রায় দুই বছর পার হলেও বিষয়টি ঝুলে থাকে। মাঝে দায়িত্ব নেওয়া সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী চেয়ারম্যান হিসেবে বিষয়টি মেটানোর চেষ্টা করলেও ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করায় তা আর এগোয়নি। বর্তমানে তিনি এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ব্যাংকের এক পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, একদল কর্মচারীর চাপ প্রয়োগের কারণে সৃষ্ট এই জটিলতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া সমাধান কঠিন। তাঁর মতে, একবার কর্মীদের হাতে টাকা পৌঁছে গেলে তা ফেরত আনাও বাস্তবে সহজ কাজ নয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালের মার্চে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রথমবার ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দিয়ে বাড়তি দুই বোনাসের টাকা ফেরত আনার নির্দেশ দেয়। কিন্তু দেড় বছর পার হয়ে গেলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই অর্থ আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরোনো ও নতুন—দুই ধরনের নীতিমালার কোনোটিতেই পাঁচ বোনাস দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও ব্যাংকটি নিয়ম ভেঙে এই অর্থ পরিশোধ করেছিল। পরে ব্যাংকের পক্ষ থেকে নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমা চেয়ে অনুমোদনের আবেদন করা হলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তা মেনে নেয়নি।
সম্প্রতি গত ১১ সেপ্টেম্বর আরও একবার চিঠি দিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পাঁচ বোনাসের বিষয়টি অনুমোদনযোগ্য নয় এবং বাড়তি দুই বোনাসের টাকা কর্মীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয় করতে হবে। জানা গেছে, ব্যাংকের প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত তিনটি বোনাসের পাশাপাশি বাড়তি দুটি বোনাসও নিয়েছেন। প্রতিটি বোনাসের অর্থ মূলত একজন কর্মীর এক মাসের মূল বেতনের সমান, এবং একটি বোনাসের সম্মিলিত পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা—এই হিসাবেই বাড়তি দুই বোনাসের মোট অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ১১৬ কোটি টাকায়।
এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শওকত আলী খান বলেছেন, পাঁচ বোনাসের সিদ্ধান্তটি তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছিল। টাকা যেহেতু ইতিমধ্যে পরিশোধ হয়ে গেছে, সেহেতু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে বিষয়টি মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আসছে এবং নতুন করে আবারও একই অনুরোধ জানানো হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পরিদর্শন প্রতিবেদনেও এই অনিয়মের বিস্তারিত ধরা পড়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিনের হিসাব অনুযায়ী তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকটি ২০২৩ সালের বোনাস বাবদ প্রায় ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে, আর ২০২৪ সালের জন্য সংস্থান রাখা হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানায়, সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালাতেও তিনটির বেশি বোনাসের বিধান নেই। তবু চাপের মুখে পরিচালনা পর্ষদ শর্তসাপেক্ষে পাঁচ বোনাসের প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল—শর্ত ছিল, ভবিষ্যতে কোনো আপত্তি উঠলে সংশ্লিষ্টরা টাকা ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন এবং এ বিষয়ে ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামাও দিতে হবে তাঁদের।
এই ঘটনা কেবল সোনালী ব্যাংকেই সীমাবদ্ধ ছিল না; রাষ্ট্রমালিকানাধীন অন্য ব্যাংকগুলোতেও একই ধরনের ঢালাও বোনাস প্রদানের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। এই সমস্যা মোকাবিলায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একটি নতুন নির্দেশিকা জারি করে, যা রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক, তফসিলি ও অ-তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীর জন্য প্রযোজ্য। নতুন এই নির্দেশিকায় বোনাস প্রদানের আগে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট সূচকে মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে—চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার, আমানত বৃদ্ধির হার, ঋণ ও অগ্রিমের প্রবৃদ্ধি, শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের হার এবং অবলোপনকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের হার।
এসব সূচকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মুনাফার হারকে, যেখানে পঞ্চাশের বেশি নম্বর নির্ধারিত রয়েছে। সার্বিক নম্বরের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে কোনো ব্যাংক কতটি বোনাস দিতে পারবে—বেশি নম্বর পেলে সর্বোচ্চ তিনটি বোনাস মিলবে, নম্বর কম হলে বোনাসের সংখ্যাও কমে যাবে, এবং একেবারে কম নম্বর হলে কোনো বোনাসই দেওয়া যাবে না। এই কাঠামো কার্যকর হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে বোনাস প্রদান আর কোনো কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাধীন বিষয় থাকছে না, বরং তা সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বাস্তব আর্থিক ফলাফল ও ঋণ আদায়ের সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সোনালী ব্যাংকের এই বোনাস-বিতর্ক রাষ্ট্রমালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শাসন-ব্যবস্থার একটি দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে—যেখানে চাপের মুখে নীতিমালা উপেক্ষা করার ঘটনা ঘটলেও পরবর্তীতে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন নির্দেশিকা এই ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে একটি কাঠামোগত পদক্ষেপ হলেও, সোনালী ব্যাংকের বিদ্যমান ১১৬ কোটি টাকা প্রকৃতপক্ষে ফেরত আসে কি না, তা নির্ভর করছে সরকারের দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও কার্যকর প্রয়োগের ওপর।

