উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ’ নামের এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন পাবেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এই অর্থায়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবার জন্য প্রযোজ্য নয়; আবেদনকারীর ব্যবসায়িক ধারণা, প্রকৃত প্রয়োজন ও ব্যয় পরিকল্পনা যাচাইয়ের পর অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট ১৩ সেপ্টেম্বর ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করেছে। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের আট জেলার ৬৪টি উপজেলায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে। জেলাগুলো হলো, মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনা। প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে প্রথম ধাপে বাছাই করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচির আওতায় আবেদন গ্রহণ শুরু হবে ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে, চলবে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের পর পাওয়া আবেদন বিবেচনা করা হবে না। আবেদন করতে হলে শেষ তারিখে বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং তাঁর নিজস্ব ব্যবসায়িক উদ্যোগ, ব্যবসায়িক ধারণা অথবা নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগসহ প্রচলিত আইনে বৈধ সব ধরনের ব্যবসা এই কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবে।
তবে কর্মসূচির সুবিধা পেতে কিছু শর্ত মানতে হবে। আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ঋণ নেওয়া থাকলে আবেদনকারী যোগ্য হবেন না। একইভাবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তি এই অর্থায়ন পাবেন না। সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও আবেদন করতে পারবেন না। আবেদনপত্রে ভুল তথ্য দেওয়া, অন্যের ব্যবসায়িক ধারণা নিজের নামে ব্যবহার করা কিংবা তদবিরের চেষ্টা প্রমাণিত হলে আবেদন বাতিলের পাশাপাশি কালো তালিকাভুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।
এই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঋণের জন্য সহায়ক জামানত নেওয়া হবে না। তবে জামানত না থাকলেও অর্থায়নটি দায়িত্বহীনভাবে ব্যবহারের সুযোগ নেই। নির্বাচিত উদ্যোক্তার ব্যাংকঋণ ও অনুদানের অর্থ একই সময়ে এককালীন তাঁর ব্যাংক হিসাবে দেওয়া হবে। ঋণের অংশ নির্ধারিত সময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হলে অথবা অর্থের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে অনুদান হিসেবে দেওয়া অর্থও ঋণে রূপান্তরিত হবে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান পাওয়ার সুযোগ থাকলেও ঋণের শর্ত ভঙ্গ করলে সেই সুবিধা আর অনুদান হিসেবে থাকবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি শুধু অর্থ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, অভিজ্ঞ মেন্টরের ধারাবাহিক পরামর্শ, ব্যবসা নিবন্ধন এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি বাজারসংযোগ তৈরির সুযোগও থাকবে। ফলে ব্যবসার ধারণা থাকলেও যারা অর্থের অভাবে শুরু করতে পারছেন না, তাঁদের জন্য কর্মসূচিটি প্রাথমিক মূলধনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আবেদন গ্রহণ ও উদ্যোক্তা অনুসন্ধানের কাজ পরিচালনা করবে তফসিলি ব্যাংকগুলো। উপজেলা পর্যায়ে ব্যাংকের শাখাগুলো প্রচার, আবেদন গ্রহণ ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা শনাক্ত করবে। প্রতিটি উপজেলায় একটি ব্যাংককে লিড ব্যাংক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট জেলার সব আবেদন জেলা লিড ব্যাংকের মাধ্যমে সমন্বয় করে যাচাই-বাছাই করা হবে। আবেদনকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ থাকলে সেটি, পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং নির্ধারিত আবেদন ফরম জমা দিতে হবে।
তবে এই কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে শুধু অর্থ ছাড়ের ওপর নয়, বরং প্রকৃত উদ্যোক্তা নির্বাচন ও পরবর্তী তদারকির ওপরও। ব্যবসার ধারণা যাচাই না করে অর্থ দেওয়া হলে ঋণ ও অনুদান দুটিই অপচয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আবার অতিরিক্ত কাগজপত্র, ব্যাংকের ধীরগতি বা স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যের ঘাটতি থাকলে প্রকৃত উদ্যোক্তারাও বাদ পড়তে পারেন। তাই স্বচ্ছ যাচাই, সহজ আবেদনপ্রক্রিয়া এবং অর্থ পাওয়ার পর নিয়মিত পরামর্শ, এই তিনটি বিষয় কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য জেলার উপজেলাতেও কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হবে। প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন ও সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হলে উপজেলা পর্যায়ের ব্যবসায়িক ধারণাগুলোকে ছোট পরিসরের উদ্যোগ থেকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে অর্থায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ ও উদ্যোক্তা নির্বাচনের মানের ওপর।

