বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের ব্যস্ত জনপদের যাতায়াত সংকট কমাতে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও জয়দেবপুরকে যুক্ত করে নির্মাণ করা হবে বৈদ্যুতিক রেলপথ।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮ দশমিক ২৩ বিলিয়ন টাকা। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আজ বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে এটি হবে বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে প্রতিদিন প্রায় ৬০টি ট্রেন চলাচল করবে। প্রতি ৩০ মিনিট পরপর যাত্রীদের জন্য ট্রেনের ব্যবস্থা থাকবে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন এই বৈদ্যুতিক ট্রেন ব্যবস্থায় পাঁচটি কোচের বৈদ্যুতিক ট্রেন ব্যবহার করা হবে। প্রতিটি ট্রেনে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে। সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দুই সেট ট্রেন প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর চলাচল করবে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত শহরগুলোর একটি। প্রতিদিন লাখো মানুষ ঢাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার কারণে সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই যানজট শুধু মানুষের কর্মঘণ্টাই নষ্ট করছে না, পাশাপাশি জ্বালানি খরচ, পরিবেশ দূষণ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীকেন্দ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থায় দ্রুতগামী গণপরিবহন যুক্ত করা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। বৈদ্যুতিক ট্রেন এই ক্ষেত্রে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে, কারণ এটি একই সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষকে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পরিবহন করতে সক্ষম।
বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ মহাসড়কের কাছাকাছি মাওনা এলাকার মধ্যে কোথাও বৈদ্যুতিক ট্রেনের জন্য একটি বিশেষ কারখানা ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। সেখানে বৈদ্যুতিক ট্রেন ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও পাওয়া যাচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক যৌথভাবে প্রায় ২৮ দশমিক ৮০ বিলিয়ন টাকা উন্নয়ন সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি ২০৩১ সালের জুন মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে শুধু যাত্রীসেবার মানই বাড়বে না, কমবে পরিচালন ব্যয়ও। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী হবে। পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
পরিবেশের দিক থেকেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৈদ্যুতিক ট্রেন ব্যবহারের ফলে কার্বন নিঃসরণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এটি দেশের পরিবহন খাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে মূলত ডিজেলচালিত বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন ব্যবহার করে থাকে। তবে নতুন প্রকল্পে সরাসরি বিদ্যুৎচালিত রেল ব্যবস্থা চালু হবে, যা গতি, দক্ষতা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিক থেকে বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকবে।
বৈদ্যুতিক ট্রেনের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর দ্রুত গতি বৃদ্ধি ও কম সময়ে স্টেশন থেকে সর্বোচ্চ গতিতে পৌঁছানোর সক্ষমতা। ফলে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে যাতায়াতের সময় অর্ধেকেরও বেশি কমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধু এই রুটেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বৈদ্যুতিক রেলের পরিকল্পনা। ভবিষ্যতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে বৈদ্যুতিক রেল ব্যবস্থায় বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছে। ভারতের রেলওয়ে তাদের প্রশস্ত রেলপথের প্রায় ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ বিদ্যুতায়িত করেছে, যা বিশ্বের অন্যতম বড় রেল অবকাঠামো পরিবর্তনের উদাহরণ। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড পুরো দেশের রেলপথকে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার আওতায় এনে দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশের জন্য বৈদ্যুতিক ট্রেন শুধু একটি নতুন পরিবহন ব্যবস্থা নয়, বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। দ্রুত বাড়তে থাকা নগর জনসংখ্যা ও যাতায়াত চাহিদার কথা বিবেচনা করলে এই প্রকল্প ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বৈদ্যুতিক রেল চালু হলে রাজধানী ও আশপাশের এলাকার মানুষের দৈনন্দিন যাত্রায় স্বস্তি আসার পাশাপাশি দেশের রেল খাতও আধুনিক প্রযুক্তির নতুন পথে এগিয়ে যাবে।

