দেশের ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে। গত নয় মাসে ঋণ আদায়ে জোরদার উদ্যোগ এবং ব্যাংক খাতে চলমান সংস্কারের ফলে খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় তিন শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যা ছিল প্রায় সাড়ে পঁয়ত্রিশ শতাংশ, চলতি বছরের জুনে এসে তা নেমে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে বত্রিশ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, নয় মাসের ব্যবধানে এই হার কমেছে প্রায় পৌনে তিন শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে অনুপাত কমলেও মোট খেলাপি ঋণের অঙ্ক এখনও বিশাল। জুন পর্যন্ত হিসাবে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় সাড়ে বত্রিশ শতাংশের সমান। আগের বছরের সেপ্টেম্বরে এই পরিমাণ ছিল ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ টাকার অঙ্কে সামান্য বাড়লেও মোট ঋণের তুলনায় অনুপাত কমে গেছে, যা মূলত সামগ্রিক ঋণ বিতরণ বৃদ্ধিরই প্রতিফলন।
ব্যাংকিং খাত বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থাকা বা লুকানো খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াই এই উন্নতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ্যে আনার ওপর জোর দিতে শুরু করে। এর ফলে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে আগে আড়াল করে রাখা অনেক ঋণের বাস্তব চিত্র সামনে চলে আসে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, খেলাপি ঋণ কমাতে সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে—এর মধ্যে রয়েছে একবারের জন্য বিশেষ প্রস্থান সুবিধা এবং সর্বোচ্চ পনেরো বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা। এসব উদ্যোগের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হলে খেলাপি ঋণের অনুপাত ভবিষ্যতে আরও কমতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের একজন বিশিষ্ট ফেলো এই প্রসঙ্গে অতীতের পরিসংখ্যানের অসঙ্গতির কথা তুলে ধরেন। তার মতে, আগের সরকারের সময় প্রকাশিত খেলাপি ঋণের হিসাব প্রকৃত অবস্থা সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরেনি। প্রায় দেড় দশক আগে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র বাইশ হাজার কোটি টাকার মতো, যা সরকারি হিসাবেই বেড়ে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকাশিত একটি শ্বেতপত্রে দেখা যায়, প্রকৃত খেলাপি ও সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ আসলে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।
তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান সংস্কার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বলেন, বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুদ্ধারে এই সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণ কমানোর ওপর সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খেলাপি ঋণ কমার এই ধারাকে এখনই পুরোপুরি সাফল্য বলার সুযোগ নেই। কারণ প্রকৃত খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ায় শুরুতে অনুপাত সাময়িকভাবে বেড়েও যেতে পারে। তাদের মতে, ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করাই টেকসই সংস্কারের প্রথম ও প্রধান শর্ত।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, হিসাব-নিকাশ পরিষ্কার করার এই প্রক্রিয়ায় স্বল্প মেয়াদে কিছুটা চাপ তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং কাঠামো গড়ে তুলবে। এ জন্য দরকার পেশাদার ব্যবস্থাপনা, যথাযথ ঋণ মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং কার্যকর আদায় ব্যবস্থা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য সংস্কার কাঠামো আরও জোরদার করছে বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদনের মানদণ্ড অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণক্ষতির হিসাব চালু হলে ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকি আরও আগেভাগে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
বিশ্লেষকদের মূল বার্তা হলো—কেবল প্রকাশিত খেলাপি ঋণের সংখ্যা কমানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে এর মূল কাঠামোগত কারণগুলো দূর করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন ঋণ আদায় প্রক্রিয়া জোরদার করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঋণ বিতরণে কঠোর যাচাই-বাছাই এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ওই ফেলোর ভাষায়, বর্তমান সরকার বিপুল খেলাপি ঋণ ও আস্থাহীনতার একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার উত্তরাধিকার পেয়েছে, তাই পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
সার্বিকভাবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত নয় মাসের এই উন্নতি ব্যাংক খাতের সংস্কারের একটি ইতিবাচক প্রাথমিক সংকেত হলেও এর স্থায়িত্ব বোঝার জন্য চলতি বছরের ডিসেম্বরের পরিসংখ্যানই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। ধারাবাহিক সংস্কার, কঠোর ঋণ আদায় নীতি এবং সুশাসন বজায় থাকলে খেলাপি ঋণের হার আরও কমার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের হারানো আস্থাও পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

