অনলাইনে দ্রুত ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, অতিরিক্ত সুদ আদায় এবং হয়রানির অভিযোগের পর অবৈধ ঋণ অ্যাপগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
দেশের সব ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য অর্থ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানকে অননুমোদিত অনলাইন ঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী মোবাইল অ্যাপগুলোর সঙ্গে সব ধরনের পেমেন্ট সেবা অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃথক চিঠি পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনসহ (বিটিআরসি) অন্যান্য সংস্থাকে এসব অবৈধ ঋণ অ্যাপ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, অননুমোদিত এসব অ্যাপ গুগল প্লে স্টোরসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় রয়েছে। এগুলোর ব্যবহার ও কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, কিছু মোবাইল অ্যাপ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে উচ্চ সুদের হারে ঋণ দিচ্ছে। এর ফলে ঋণগ্রহীতারা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এসব অ্যাপ ব্যবহারকারীর অজান্তে মোবাইল ফোনের সংরক্ষিত তথ্য, যোগাযোগ তালিকা, ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও এবং বার্তার মতো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। পরে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনেক ক্ষেত্রে এসব তথ্য ব্যবহার করে ভয় দেখানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা তথ্য প্রকাশের হুমকি এবং চাপ প্রয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইন, ২০২৪-এর ১৫(২) ধারা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনলাইন কিংবা অফলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনিয়োগ সংগ্রহ, ঋণ প্রদান, অর্থ সংরক্ষণ বা আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করতে পারে না।
যেহেতু এসব অ্যাপ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাই এগুলোর কার্যক্রম আইন অনুযায়ী অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও সতর্ক করে বলেছে, শুধু অ্যাপ পরিচালনাকারীরাই নয়, এসব অবৈধ ঋণ কার্যক্রমে লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে সহযোগিতা করা ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল আর্থিক সেবা এবং পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আইনের আওতায় আনা হতে পারে।
এ কারণে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এসব অ্যাপের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের সুবিধা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও (বিএফআইইউ) সাধারণ মানুষকে অননুমোদিত মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিল।
সংস্থাটি জানিয়েছিল, কিছু অবৈধ অ্যাপ ঋণের নামে মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে জড়িত।
বিএফআইইউ এমন ৩০টি অবৈধ অ্যাপ শনাক্ত করেছিল। এসব অ্যাপের মধ্যে রয়েছে সাথী লোন, পপ ক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কোয়ানজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, ক্যাশ-হোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধর্য লোন, ফিন ডট ডু, বঙ্গোক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী, লোন হাত এবং টাকা নাও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। দ্রুত ঋণ পাওয়ার আশায় অনেক মানুষ যাচাই ছাড়া এসব অ্যাপ ব্যবহার করছেন। ফলে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এর আগে ২৪ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সহজ ঋণ এবং দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে পরিচালিত কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। অনেক মানুষ এসব অ্যাপের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনার মাধ্যমে এখন অবৈধ ঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী অ্যাপগুলোর আর্থিক লেনদেনের পথ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো ডিজিটাল ঋণ সেবায় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।

