কোনো একটি ব্যাংকে সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে আলাদা আলাদা ব্যাংক নয়, পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে দেখতে হবে। এমন মত দিয়েছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
আজ শনিবার রাজধানীর বিজয়নগরে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের কার্যালয়ে এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। সভার বিষয় ছিল ব্যাংকিং খাতের গভীর আর্থিক বিশ্লেষণ। তিনি সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন সিএফএ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মাহতাব ওসমানী ও নর্থ স্টার ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের মো. মিনহাজ জিয়া। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিএফএ সোসাইটির সেক্রেটারি এস এম গালিবুর রহমান।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আগে খেলাপি ঋণকে মূলত সরকারি ব্যাংকের সমস্যা মনে করা হতো। এখন বেসরকারি ব্যাংকসহ পুরো খাতেই এটি বড় সংকট। খেলাপি ঋণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তাই একে কোনো একটি ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তাঁর মতে, ব্যাংকগুলো এখন মূল ব্যবসা, অর্থাৎ ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বেশি ঝুঁকছে। এতে মুনাফা বাড়লেও তা ব্যাংকের মূল ব্যবসার প্রকৃত সক্ষমতা দেখায় না।
তিনি জানান, গত দুই বছর ব্যাংক খাতে মুনাফার কিছু বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময় অনেক ব্যাংক উল্লেখযোগ্য আয় করেছে। একই সঙ্গে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকেও আয় এসেছে। ফলে কিছু ব্যাংকের ঋণ কমলেও সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ ও মুনাফা বেড়েছে।
ব্যাংকের মূল কাজ হলো অর্থ সংগ্রহ করে ঋণ দেওয়া এবং সুদ আয় করা। তাই মুনাফা বিশ্লেষণের সময় বিনিয়োগ আয় ও সুদ আয় কীভাবে দেখানো হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। নিট সুদ আয় আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন।
মুনাফা বাড়লেও সামনে সংরক্ষিত অর্থের (প্রভিশন) প্রয়োজন বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে নীতিগত সহায়তার আওতায় দেওয়া ঋণের একটি অংশ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এখন এসব ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো না গেলেও ভবিষ্যতে এর বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হতে পারে। তাতে ব্যাংকের ব্যয় বাড়বে।
এ কারণে ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত খুঁজতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, বড় শিল্পগোষ্ঠীকে দেওয়া ঋণের বড় অংশ নগদ অর্থায়নের মাধ্যমে হয়। ঋণ আদায়ে সমস্যা হলে ব্যাংকের ওপর চাপ আরও বাড়বে, এমনকি ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শুধু আমানত ও বিনিয়োগের হিসাব দেখে কোনো ব্যাংকের তারল্য ভালো বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ বিনিয়োগের বড় অংশ আটকে গেলে কাগজে-কলমে তারল্য থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমানত নিলে তা বিনিয়োগ করে আয় করতে হয়। আমানত নেওয়া বন্ধ করা সমাধান নয়। এখন অনেক ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করে সরকারি সিকিউরিটিজে লগ্নি করছে। ফলে ঋণের বদলে সরকারি সিকিউরিটিজ ব্যাংকের সম্পদে বড় জায়গা নিচ্ছে।
নীতি সুদহার কমার সঙ্গে আন্তব্যাংক সুদহারও কমছে। অনেক ব্যাংক এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপোর বদলে আন্তব্যাংক বাজার থেকে অর্থ সামলানোর চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতে নীতি সুদহার আরও কমলে ব্যাংকের আয় ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ আসতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
সরকারের ঋণ নেওয়া ও শোধ করার সক্ষমতাও ব্যাংক খাতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ব্যাংকগুলো সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, কিন্তু সরকারকে একসময় তা পরিশোধ করতে হবে। এদিকে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা ও কর-জিডিপি অনুপাত নিয়েও চাপ আছে। তাই সরকারি ঋণ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে পরিশোধের জন্য দেশীয় সম্পদ বা রাজস্ব থেকে অর্থ জোগাড় করতে হবে।
বৈদেশিক মুদ্রা নিয়েও তিনি উদ্বেগ জানান। তাঁর ভাষ্য, আগে দেশে যে পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা আসত, তা দিয়ে বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল দুটিই শোধ করা যেত। এখন বিদেশি বিনিয়োগসহ আর্থিক হিসাবে প্রবাহ কমায় সেই সক্ষমতা আগের মতো নেই। সামনে এই বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মুনাফা ধরে রাখতে তহবিলের খরচ কমানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি। আমানতের খরচ বেশি হলে শুধু ঋণের সুদ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করা যায় না, কারণ এর সঙ্গে পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য খরচ জড়িত। তাই ব্যাংকের প্রকৃত মার্জিন বুঝতে হলে শুধু ঋণ ও আমানতের সুদের ফারাক দেখলে হবে না, পুরো ব্যয় কাঠামোও বিবেচনায় নিতে হবে।
ভালো গ্রাহক ধরে রাখতে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দরকার। তাই আয় ও খরচ দুটিই বিবেচনা করে মার্জিন ঠিক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত হিসাব ও সূচক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বিশ্লেষণেও যথাযথভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ সামলাতে আলাদা প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো করা হলে সেখানে পর্যাপ্ত মূলধন, বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন এবং সম্পদমূল্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বা “হেয়ারকাট” বিবেচনায় রাখতে হবে।
তবে শুধু সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গড়লেই সমস্যা মিটবে না। সঙ্গে চাই সুশাসন, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক বা অন্য যেকোনো প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত। ভবিষ্যতে একই সংকট এড়াতে কার্যকর সংস্কার ও কঠোর শাসনব্যবস্থা লাগবে।
তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ তিনটি: প্রতিটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সঠিকভাবে নির্ণয় করা, সক্ষম ও নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করা। সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডও মানতে হবে। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়া সম্ভব।
বক্তব্যে একটি সূত্র পরিষ্কার। ব্যাংকগুলো ঋণ কমিয়ে নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ রাখছে। এতে মুনাফা দেখা গেলেও অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়। একই সঙ্গে ব্যাংকের সম্পদ সরকারের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি ও সরকারের রাজস্ব পরিস্থিতি আলাদা করে দেখা কঠিন। তবে এটি প্রতিবেদনের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে করা বিশ্লেষণ। সভায় এ নিয়ে আলাদা সুপারিশ বা পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়নি।

