দেশের ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। শনিবার রাতে রাজধানীর মিরপুরে এক স্মারক বক্তৃতায় এ কথা বলেছেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তাঁর মতে, লুটপাটে জড়িত ক্ষমতাকাঠামো ভাঙতে না পারলে ব্যাংক খাতে নিয়মকানুন ফেরানোর আশা বাস্তবসম্মত নয়। অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, এই বন্ধন ভাঙার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) ‘ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা’ শিরোনামে ২৩তম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে। মিরপুরে বিআইবিএম মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটি হয়। সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম। মূল বক্তা ছিলেন মাহবুব উল্লাহ।
মাহবুব উল্লাহর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ব্যাংক থেকে অর্থ লুটের কাঠামো। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, লুটেরা ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া হাজার হাজার কোটি টাকা লুট সম্ভব হতো না। তাঁর ভাষ্য, লুটেরারা শুধু অর্থ আত্মসাৎ করেই থামেনি, সেই অর্থ বিদেশেও পাচার করেছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি একে “নেক্সাস” বা আঁতাত বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, ব্যাংকের অর্থ হাতিয়ে নিতেই এমন একটি চক্র গড়ে উঠেছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নিয়ন্ত্রকদের চোখের সামনে কয়েকটি ব্যাংকের নিয়মকানুন দুমড়েমুচড়ে ফেলা হয়েছে। তিনি যেসব ব্যাংকের নাম উল্লেখ করেন, সেগুলো হলো:
- এক্সিম ব্যাংক
- ইসলামী ব্যাংক
- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক
- ন্যাশনাল ব্যাংক
- আইএফআইসি ব্যাংক
- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
- ইউনিয়ন ব্যাংক
- গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
মাহবুব উল্লাহ বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন বদলে খেলাপিদেরও ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাংক খাতে আইনের শাসনের জায়গায় শাসকদের ইচ্ছাই চলেছে বলে তাঁর মন্তব্য। পরিচালকেরা নিজের ব্যাংক ছাড়া অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন, এই সুযোগও তিনি সমালোচনার মুখে তোলেন।
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ সহজ ভাষায় ব্যাংকের কাজ বুঝিয়েছেন। ব্যাংকের মূল শক্তি হলো ঘূর্ণায়মান তহবিল। ব্যাংক ঋণ দেয়। সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ ফেরত আসে। ওই অর্থ দিয়ে আবার নতুন ঋণ দেওয়া হয়। এভাবেই চক্রটি চলে। কিন্তু দেশে ৩২ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। ফলে এই চক্র প্রায় ভেঙে পড়েছে। তাঁর হিসাবে, আমানতকারীদের রাখা প্রতি ৩ টাকার ১ টাকাই বাজারে আটকে আছে। তিনি মনে করেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শেয়ারবাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুল অর্থ বেহাত হওয়ায় অনেক ব্যাংক প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। ইসলামী ব্যাংকের মতো একসময়ের ভালো ব্যাংকও দুর্দশায় পড়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। আবার অধিকাংশ আমানতকারী একসঙ্গে টাকা চাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর ফলে দেশের আর্থিক খাত ভয়াবহভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মাহবুব উল্লাহর মতে, অর্থনীতিতে এখন প্রতিযোগিতার চেয়ে স্বজনপ্রীতি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। অনুপার্জিত আয় বা রেন্ট সিকিং সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। দুর্নীতি ছড়িয়ে আছে সবখানে। এমন কাঠামোয় পরিণত পুঁজিবাদের উপযোগী ব্যাংকিং নৈতিকতা কাজ করবে, এমন ভাবনা বাস্তবসম্মত নয়।
তাই তিনি প্রভাবশালী ধনিক গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা বলেন। তবে তিনি নিজেই এর জটিলতাও তুলে ধরেন। এই গোষ্ঠী অর্থনীতির মূল্যশৃঙ্খলের অংশ। সরবরাহব্যবস্থা তাঁদের হাতে। তাঁরা চাইলে বড় সংকট তৈরি করতে পারেন। তাই রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ সাধারণত তাঁদের অসন্তুষ্ট করতে চায় না। এখানেই ব্যাংকিং নৈতিকতা ও বাস্তবতার মধ্যে আপাতবিরোধ তৈরি হয়।
সভাপতির বক্তব্যে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, মাহবুব উল্লাহ একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীস্বার্থ জড়িয়ে থাকা অপরিণত পুঁজিবাদী কাঠামোয় প্রকৃত ব্যাংকিং নৈতিকতা কতটা সম্ভব। গভর্নর এই সংশয়কে অমূলক মনে করেন না। তবে তিনি জানান, বন্ধন ভাঙার প্রথম ধাপের কাজ শুরু হয়েছে। এই ধাপে রয়েছে:
- একক পরিবার বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ সীমিত করা
- রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পর্ষদ থেকে সরানো
- অর্জিত সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আইনিভাবে প্রমাণ করা
গভর্নরের ভাষ্য, ব্যাংক কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের অগণিত আমানতকারীর সম্পদ। এই দর্শন বাস্তবায়নে তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বিশ্লেষণ: প্রথমত, সমস্যাটি কাঠামোগত। বক্তারা মনে করেন, শুধু নতুন নিয়ম করলেই ব্যাংকিং নৈতিকতা ফিরবে না। মূল সমস্যা ক্ষমতা ও অর্থের সম্পর্কে। তাই সংস্কারের কেন্দ্রেও থাকতে হবে সেই সম্পর্ক।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা হয়েছে। প্রভাবশালী গোষ্ঠী অর্থনীতির সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক। তাঁদের একবারে বিচ্ছিন্ন করলে অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগতে পারে। ফলে সংস্কারকে সতর্ক ও ধাপে ধাপে এগোতে হবে।
তৃতীয়ত, আমানতকারীর আস্থাই মূল বিষয়। আমানতের বড় অংশ আটকে থাকা এবং একসঙ্গে টাকা তোলার চাপ, দুটোই আস্থার সংকটের লক্ষণ। ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে আস্থা ফেরানো সবচেয়ে জরুরি।
চতুর্থত, নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ এসেছে। আবার একই মঞ্চে গভর্নর সংস্কারের অঙ্গীকার করেছেন। কাজেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব জবাবদিহিও সংস্কারের অংশ হওয়া দরকার।
পঞ্চমত, অঙ্গীকার ও বাস্তবায়নের ব্যবধান। গভর্নর বলেছেন কাজ শুরু হয়েছে। তবে কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণ কমে, তা দেখার বিষয়। বিশেষ করে সম্পদের মালিকানা আইনিভাবে প্রমাণের কাজটি সময়সাপেক্ষ।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: লুটপাটে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশের বিষয়টি বক্তার নিজস্ব মূল্যায়ন ও অভিযোগ। আদালতে প্রমাণিত কোনো রায় হিসেবে এটি উপস্থাপন করা হয়নি। সব মিলিয়ে, বক্তৃতায় একটি বার্তা স্পষ্ট। ব্যাংক খাত সারাতে শুধু আইন বা নীতিমালা যথেষ্ট নয়। ক্ষমতার সঙ্গে অর্থের অস্বচ্ছ সম্পর্কের অবসান ঘটাতে হবে। আমানতকারীর স্বার্থ, আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে সংস্কারের আসল পরীক্ষা।

