নারীদের আমানত হিসাব খোলা বা ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ জামিনদার বা সহ-স্বাক্ষরকারী চাওয়ার দিন শেষ হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি খসড়া নির্দেশিকা তৈরি করেছে, যেখানে পুরুষ জামিনদার চাওয়াকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ‘জাতীয় নারী আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নির্দেশিকা’ নামের এই খসড়াটি গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে জনমত জানানোর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। নির্দেশিকাটি চূড়ান্ত হলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি ও পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
বাংলাদেশে নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি বড় বাধা হলো পুরুষ জামিনদারের বাধ্যবাধকতা। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা নিজের নামে ব্যাংক হিসাব খুলতে বা ঋণ নিতে গেলে তাঁদের স্বামী, বাবা বা অন্য কোনো পুরুষ আত্মীয়ের জামিনদার বা সহ-স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। অথচ আইনে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। খসড়া নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ নারী জানিয়েছেন তাঁদের পুরুষ জামিনদার দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্র, স্বামীর নামে ইউটিলিটি বিল এবং অন্যান্য ‘ছায়া’ কাগজপত্র চাওয়াকেও নারীদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবায় প্রবেশের বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এখন কঠোর নিয়ম আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খসড়া নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি নারী গ্রাহকের কাছ থেকে ‘ছায়া জামিনদার’ হিসেবে পুরুষের সম্মতি চায়, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রকের নির্ধারিত ন্যূনতম শর্তের বাইরে অতিরিক্ত কোনো কাগজপত্র চাওয়া বন্ধ করতে হবে। ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি এবং পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের শাখা, বুথ ও ব্রোকারেজ হাউসে ‘নিজের অধিকার জানুন’ সাইনবোর্ড প্রদর্শন করতে হবে। এই নিয়ম বাস্তবায়িত হলে নারীরা নিজের নামে সরাসরি আর্থিক সেবা নিতে পারবেন, যেখানে পুরুষের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
খসড়া নির্দেশিকায় জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জরিপ ২০২৫-এর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, যা চিত্রটি আরও স্পষ্ট করে। সে অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাত্র ১৬ শতাংশ নারী আনুষ্ঠানিকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেন, বিপরীতে ৩৩ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক উৎসের ওপর নির্ভর করেন। গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ হিসাবের মধ্যে নারীর অংশ মাত্র ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, আর তাঁদের ঋণের গড় আকার পুরুষদের তুলনায় তিন থেকে আট গুণ ছোট। সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নারীর হার ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ, পুরুষের ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থাৎ ৮ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধান। মোবাইল আর্থিক সেবায় এই ব্যবধান আরও বড়; নারীদের অংশ ৩৬ শতাংশ, পুরুষের ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ। আর সক্রিয় মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারে নারীর হার মাত্র ০ দশমিক ৮ শতাংশ, পুরুষের ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
খসড়া নির্দেশিকায় নারীদের ঋণপ্রাপ্তি বাড়াতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে নারী-কেন্দ্রিক অন্তত একটি ঋণপণ্য চালু করতে হবে, যেখানে অস্থাবর সম্পত্তি বাধ্যতামূলক জামানত হিসেবে চাওয়া যাবে না। ঋণ মূল্যায়নে নগদ প্রবাহভিত্তিক পদ্ধতি, ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড এবং ক্ষুদ্রঋণের পরিশোধের ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যমান নিয়মে ব্যাংক ও আর্থিক কোম্পানিগুলোর সিএমএসএমই ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা বা নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে যেতে হবে, যা বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া সিএমএসএমই ঋণ কর্মকর্তাদের জন্য লিঙ্গ-সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ এবং ঋণে ছায়া জামিনদার চাওয়া নিষিদ্ধ করার কথাও নির্দেশিকায় রয়েছে।
খসড়া নির্দেশিকায় ডিজিটাল আর্থিক সেবাদাতাদের জন্যও নতুন বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। মোবাইল অ্যাপে বাংলা ভয়েস গাইডেন্স, মূল লেনদেনের জন্য ইউএসএসডি ও এসএমএস সুবিধা চালু রাখতে হবে। নারীরা পুরুষ মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই নিজের হিসাব পরিচালনা করতে পারেন কি না, তাও পরিমাপ করতে হবে। এছাড়া নারী গ্রাহকদের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি শাখায় একজন নারী ফোকাল পয়েন্ট, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন এবং সাত কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকবে। ১৫ দিনের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি না হলে তা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠানো হবে। আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বার্ষিক নারী আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মপরিকল্পনা ও প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এবং নিয়ন্ত্রকরা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে লিঙ্গ-বিভাজিত তথ্য সংগ্রহ করবেন।
নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, এর বড় অর্থনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। নারীদের ঋণপ্রাপ্তি বাড়লে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। কিন্তু পুরুষ জামিনদারের বাধ্যবাধকতা এবং অতিরিক্ত কাগজপত্রের চাহিদা নারীদের অনেক বড় অংশকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রেখেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে খসড়া নির্দেশিকাটি তিন ধাপে পাঁচ বছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে, প্রথমে তথ্য সংগ্রহ ও পাইলট প্রকল্প, এরপর দেশব্যাপী সম্প্রসারণ এবং সবশেষে পূর্ণ প্রয়োগ। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি হার বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

