প্রথম আলোর অনলাইন বিভাগের প্রধান শওকত হোসেনের এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও নাগরিক জীবনের প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক এসব বহুপক্ষীয় সংস্থা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক আউটলুক প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় যে করোনা মহামারি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট কাটিয়ে অনেক দেশ ঘুরে দাঁড়ালেও বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। উল্টো প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় থাকার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত করে যে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বেঁচে থাকার সংগ্রাম আগামী দিনগুলোতে আরও কঠিন রূপ নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, অর্থনীতির নিম্নমুখী এই ধারার পেছনে মূল সমস্যাগুলোর একটি হলো রাজস্ব আদায়ের তীব্র দুর্বলতা এবং সরকারের অপ্রয়োজনীয় বা অনুৎপাদনশীল ব্যয় বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ উন্নয়ন পর্যবেক্ষণে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে সরকারি ব্যয়ের বড় অংশই চলতি পরিচালন খাতে চলে যাচ্ছে, অথচ যা কর্মসংস্থান ও সরাসরি উৎপাদন বাড়াতে পারে এমন মূলধনি বিনিয়োগে আসছে না। একই সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের মেগা ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাজারে অর্থ সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং মূল্যস্ফীতি বা নিত্যপণ্যের দামের পারদ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে বেসরকারি খাতকে, কারণ ৩৩ বছরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় নতুন কারখানা বা ব্যবসা সম্প্রসারণ প্রায় থমকে গেছে।
অর্থনীতির অন্যতম বড় ক্ষতস্থান হলো ব্যাংকিং খাত, যেখানে বছরের পর বছর ধরে চলা খেলাপি ঋণ ও অর্থ লুটপাটের বোঝা দিনে দিনে পর্বতসম হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে যখন ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে ভঙ্গুর ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করতে কিংবা ক্যাপিটাল শর্টফল বা মূলধন ঘাটতি মেটাতে বহু বছর ধরে হাজার হাজার কোটি টাকার জোগান জনগণের পকেট বা করের টাকা থেকেই দেওয়া হতে পারে, তখন প্রশ্ন ওঠে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির মৌলিক নীতি নিয়ে। প্রভাবশালী ও ব্যাংক ডাকাতদের কাছ থেকে খেলাপি টাকা উদ্ধারে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিয়ে সাধারণ করদাতার ওপর এই বোঝা চাপিয়ে দেওয়াকে জনগণ মূলত এক ধরণের অন্যায্য ‘জরিমানা’ হিসেবেই দেখছে। আস্থার সংকটে থাকা সাধারণ মানুষ এই লুটপাটের দায়ভার কেন বইবে, সে উত্তর এখনো মেলেনি।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে যখন নীতিনির্ধারকরা বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সাথে দরকষাকষি করছেন, তখন দাতাদের শর্তের অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের গরজেই দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সংস্কার জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মূল ভিত্তিই হওয়ার কথা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বা ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’, যেখানে প্রতিটি নীতি হবে জনকল্যাণমুখী। আইএমএফ তাদের বৈশ্বিক সুপারিশে খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেছে যে, একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে বিপদের ঘূর্ণাবর্ত থেকে বের করে আনতে প্রতিটি সরকারের একটি সুস্পষ্ট ও ‘বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা’ বা ক্রেডিবল অ্যাকশন প্ল্যান থাকা আবশ্যক।

