বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশের বিনিয়োগ পাইপলাইনে বর্তমানে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’। এর মধ্যে ৪০ কোটির বেশি ডলারের বিনিয়োগ ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অথবা বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাটির ১৮০ দিনের পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি বছরের ১৬ মার্চ শুরু হওয়া এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানো এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর সুযোগ তৈরি করা।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অংশ আসছে চীন থেকে। দেশটি থেকে প্রায় ৬০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আগ্রহ রয়েছে। এরপর মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০ কোটি ডলার, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ কোটি ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ রয়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ৩০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতে প্রায় ২০ কোটি ডলার করে সম্ভাব্য বিনিয়োগ রয়েছে।
তবে ইনভেস্ট বাংলাদেশ স্পষ্ট করেছে, ১৩০ কোটি ডলারের এই হিসাব সরাসরি দেশে আসা অর্থের পরিমাণ নয়। বরং এটি বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা সম্ভাব্য বিনিয়োগের একটি চিত্র, যার মধ্যে কিছু প্রকল্প এখনো পরিকল্পনা, আলোচনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, ১৮০ দিনের পরিকল্পনার মাধ্যমে মূলত বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উন্নত অবকাঠামো, দ্রুত সেবা প্রদান এবং সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ প্রকল্পের তালিকা তৈরি অন্যতম।
তিনি বলেন, পরিকল্পনার আওতায় কিছু পরিবর্তন ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। তবে বড় আকারের প্রকল্পগুলোর বাস্তব সুফল পেতে আরও সময় প্রয়োজন হবে।
বিনিয়োগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল, প্রস্তাবিত মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ঢাকার বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। চালু হলে এই টার্মিনাল দেশের বন্দর সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়াতে পারে এবং সরাসরি ৭০০-এর বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৩০ কোটি ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের সক্রিয় বিনিয়োগ প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে এবং এটি চালু হলে এক লাখের বেশি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মোংলা বন্দরকে ঘিরেও নতুন বিনিয়োগ সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের সঙ্গে মোংলা বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে একটি প্রকল্প উন্নয়নের জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও হালকা প্রকৌশল খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা গ্রহণ আরও সহজ হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
এছাড়া বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্মে তিন দিনের ব্যবসা শুরুর প্যাকেজ চালু করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে অক্টোবর মাসে দক্ষিণ চীনের গুয়াংজুতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের একটি কার্যালয় চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন প্রণোদনা ব্যবস্থার দিকেও এগোচ্ছে সংস্থাটি। বিদেশি মূলধন সংগ্রহে সহায়তাকারী যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য প্রণোদনা হিসেবে আনা হচ্ছে একটি বিশেষ সুবিধা, যেখানে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে তারা বিদেশি মূলধনের ১ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ অনলাইন ব্যবস্থা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
পর্যটন খাতেও বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি পর্যটন সম্পদে ব্যক্তিখাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে হোটেল শৈবালকে প্রথম পরীক্ষামূলক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৩২ একর জায়গার এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো। তবে একই সঙ্গে বড় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে আগ্রহ এবং বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, নতুন প্রকল্পের অগ্রগতি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নেওয়া উদ্যোগগুলো নিয়ে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা হবে। ফলে আগামী দিনে এসব সম্ভাব্য বিনিয়োগ কতটা বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেয়, সেটিই হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

