সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে নিজের জমানো টাকা তুলতে গিয়ে আমানতকারীদের একটি কঠিন শর্তের মুখে পড়তে হচ্ছে। মূল অর্থ একবারে হাতে পেতে চাইলে তাঁদের লিখিতভাবে স্বীকার করতে হচ্ছে যে তাঁরা মুনাফা, সুদ বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা দাবি করবেন না। এমনকি ভবিষ্যতে এই আমানত নিয়ে কোনো মামলা বা আইনি লড়াইয়েও যাবেন না বলে অঙ্গীকার করতে হচ্ছে। এই নিয়মের কারণে ব্যাংকের হাজার হাজার গ্রাহকের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে কিছুটা পেছনে ফিরতে হবে। আর্থিক অনিয়মের কারণে একসময় সংকটে পড়েছিল দেশের পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এই পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, যার মালিকানা এখন সরকারের হাতে। ব্যাংকটির গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঘোষিত একটি রূপরেখা অনুসরণ করে।
এই প্রক্রিয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি পাঁচটি ব্যাংকের প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছিল, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জমা টাকার ওপর কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না—এই দুই বছরের মুনাফায় এক প্রকার কর্তন বা ‘হেয়ারকাট’ কার্যকর হবে। তবে পরে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ২৫ আগস্ট এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থের ওপর কোনো হেয়ারকাট প্রযোজ্য হবে না। পাশাপাশি ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতকারীরা তাঁদের মূল টাকা তুলে নিতে পারবেন বলেও নিশ্চিত করা হয়।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে গড়িয়েছে। হেয়ারকাট বাতিল হলেও পুরো টাকা একসঙ্গে তুলতে চাওয়া গ্রাহকদের কাছ থেকে দুই পৃষ্ঠার একটি ‘আবেদনপূর্বক অঙ্গীকারনামা’ নেওয়া হচ্ছে। এই দলিলে বলা আছে, একবার মূল টাকা নেওয়ার পর সেই আমানত হিসাব সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। এর অর্থ, গ্রাহক পরবর্তীতে আর কোনো দাবি, অভিযোগ বা মামলা করতে পারবেন না—শুধু তিনি নিজে নন, তাঁর উত্তরাধিকারী, নমিনি বা আইনগত প্রতিনিধিও এই শর্তে আবদ্ধ থাকবেন। দলিলে গ্রাহকের স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরও নেওয়া হচ্ছে।
সংখ্যার হিসাবে বিষয়টি দেখলে চিত্র স্পষ্ট হয়। ব্যাংক সূত্রের বরাত অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের ১ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার গ্রাহক টাকা তুলে নেওয়ার আবেদন করেছেন, যার পরিমাণ প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার গ্রাহক ইতিমধ্যে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থ তুলে নিয়েছেন। তবে আশার দিকও আছে—একই সময়ে ব্যাংকে নতুন আমানত এসেছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি, এবং নতুন করে খোলা হয়েছে ৩২ হাজারের বেশি হিসাব, যেখানে জমা পড়েছে আরও কয়েকশ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্র এই পরিস্থিতির একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য মতে, এই পাঁচটি ব্যাংক আগে যাদের ঋণ দিয়েছিল, তাদের কাছ থেকে মুনাফাসহ মূল টাকা ফেরত পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই টাকা এখনো ফেরত না আসায় তরল অর্থের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাই যাঁরা জরুরি ভিত্তিতে টাকা তুলতে চাইছেন, তাঁদের মুনাফার অংশ সাময়িকভাবে বাদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, সংকট কাটলে বাকি আমানতকারীরা মুনাফাসহই তাঁদের প্রাপ্য টাকা পাবেন।
তবে এই ব্যাখ্যায় খুশি নন সাধারণ আমানতকারীরা। একজন গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এই ধরনের অঙ্গীকারনামা নেওয়ার প্রক্রিয়া বৈধ নয় এবং এতে আমানতকারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি এই বিষয়ে প্রতিকার ও ন্যায্য সমাধান চেয়েছেন। আরেকজন গ্রাহক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার কাছে অভিযোগ করেছেন, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা জরুরি আবেদন তিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও শাখা পর্যায়ে বারবার সময় পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ছুটি নিয়ে ব্যাংকে গিয়েও তিনি অনুমোদন পাননি বলে জানিয়েছেন। তৃতীয় একজন গ্রাহক জানিয়েছেন, হেয়ারকাট বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পরও তাঁর শাখায় তা পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে গেছে, ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ এফডিআর বা ডিপিএস থেকে জরুরি প্রয়োজনে আংশিক টাকা তোলার আবেদনও দীর্ঘদিন আটকে ছিল।
সম্প্রতি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সব বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপককে চিঠি দিয়ে ব্যক্তিগত মেয়াদি আমানত এবং স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার নতুন করে নির্ধারণ এবং হিসাব পুনর্গণনার নির্দেশ দিয়েছে। তবে নতুন মুনাফার হার এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। এছাড়া মৃত আমানতকারীদের হিসাবের ক্ষেত্রে যথাযথ কাগজপত্র যাচাই করে উত্তরাধিকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার এবং ব্লক করা হিসাবগুলো যাচাই-বাছাই শেষে আনব্লক করে অর্থ উত্তোলনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একদিকে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হেয়ারকাট বাতিলের মতো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অন্যদিকে বাস্তব কার্যক্রমে তরলতার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা আমানতকারীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। মুনাফা ছাড়ার অঙ্গীকারনামা এবং ভবিষ্যতে আইনি পথ বন্ধ করে দেওয়ার শর্ত অনেক আমানতকারীর কাছে ন্যায্যতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণে অনেকে আবেদন করেও টাকা তুলতে আসছেন না, বরং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের এই সংকট কতটা দ্রুত কাটবে, তা নির্ভর করছে পুরোনো ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত আসার গতির ওপর—আর তার ওপরই নির্ভর করছে সাধারণ আমানতকারীদের প্রাপ্য মুনাফা কতদিনে সম্পূর্ণভাবে ফেরত পাওয়া যাবে।

