বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঋণ থেকে অর্জিত সুদ আয় হিসেবে দেখাতে না পারায় ব্যাংকগুলোর স্থগিত সুদের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর এমন ঝুলে থাকা সুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর স্থগিত সুদের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২৮ কোটি টাকা। মাত্র ছয় মাসে এই পরিমাণ বেড়েছে ১৯ হাজার ৬৭ কোটি টাকা।
ব্যাংকারদের মতে, কোনো ঋণ খেলাপি বা অনাদায়ী হয়ে গেলে সেই ঋণের ওপর জমা হওয়া সুদ ব্যাংক নিয়মিত আয় হিসেবে দেখাতে পারে না। তখন ওই সুদ আলাদা হিসাবে সংরক্ষণ করতে হয়, যাকে বলা হয় ‘সুদ স্থগিত হিসাব’।
এই অর্থ ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে পাওনা হিসেবে ব্যাংকের খাতায় থাকে। ভবিষ্যতে ঋণ আদায় হলে তখন তা আয় হিসেবে দেখানো সম্ভব হয়। কিন্তু আদায় না হওয়া পর্যন্ত এটি ব্যাংকের প্রকৃত আয় বাড়ায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থগিত সুদের পরিমাণ বাড়ার অর্থ হলো ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর একটি বড় অংশ থেকে প্রত্যাশিত আয় আসছে না। অর্থাৎ কাগজে-কলমে সুদ জমা হলেও বাস্তবে নগদ অর্থ প্রবাহ তৈরি হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে সবচেয়ে বেশি স্থগিত সুদ রয়েছে জনতা ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্থগিত সুদের পরিমাণ ২০ হাজার ৬২০ কোটি টাকা।
এর পরেই রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, যার স্থগিত সুদ ১২ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ৮ হাজার ১১২ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৬ হাজার ৬৪২ কোটি এবং সোনালী ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা স্থগিত সুদ রয়েছে।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও কয়েকটি ব্যাংকে বড় অঙ্কের সুদ স্থগিত রয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের স্থগিত সুদ ৫ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকের ৫ হাজার ২৫ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ৪ হাজার ১৯০ কোটি টাকা এবং এক্সিম ব্যাংকের ৩ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্থগিত সুদের পরিমাণ বাড়লে ব্যাংকের মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হয়। কারণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংককে একদিকে আয় দেখাতে পারে না, অন্যদিকে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় সংরক্ষণ বা প্রভিশন রাখতে হয়।
ব্যাংক খাতের বর্তমান সমস্যাটি শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঋণের বিপরীতে সুদ আয় তৈরি হলেও তা ব্যাংকের নিয়মিত আয়ে যোগ হচ্ছে না—এটি আর্থিক খাতের দুর্বলতার আরেকটি বড় ইঙ্গিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ঋণ আদায় প্রক্রিয়া কার্যকর না হলে ব্যাংকগুলোর ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। কারণ স্থগিত সুদের পরিমাণ বাড়া মানে ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান দুর্বল হচ্ছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত আদায় ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ঋণের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

