আমানত সংগ্রহের বিনিময়ে কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে বিশেষ নম্বর দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে। ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদোন্নতি নীতিমালায় এমন ব্যবস্থার সুযোগ না থাকলেও তা বহাল রাখার চেষ্টা চলছে। তাঁদের দাবি, এতে ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে। তবে এ নিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জনতা ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করে। তাতে আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিপরীতে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও নির্বাহীদের পুরস্কার এবং পদোন্নতিতে বিশেষ নম্বর দেওয়ার বিধান রাখা হয়। কিন্তু একই বছরের আগস্টে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য সমন্বিত পদোন্নতি নীতিমালা জারি করে। ওই নীতিমালায় পদোন্নতির মূল্যায়ন ও নম্বর বণ্টনের কাঠামো নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন নির্ধারিত মানদণ্ডে মোট ৯২ নম্বরের মূল্যায়ন হবে। সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার থেকে নিচের পদের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বাকি ৮ নম্বরও ওই ৯২ নম্বরের আনুপাতিক হারে ভাগ করে দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ পুরো ১০০ নম্বরই নীতিমালার নির্ধারিত কাঠামোর ভেতরে বণ্টিত হয়ে যায়। ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের দাবি, তাই আমানত সংগ্রহের জন্য আলাদা করে নম্বর দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, নতুন আদেশ জারির পর এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক আগের যেকোনো নিয়ম বা নির্দেশনা বাতিল বলে গণ্য হবে। সেই হিসাবে জনতা ব্যাংকের আগের সার্কুলার এখনো কার্যকর থাকতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রশ্নই বিতর্কের মূল কেন্দ্র।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক পদোন্নতির জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা হওয়ার কথা ছিল। সেই সভায় একটি মেমো উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, ওই মেমোর মাধ্যমে আমানত সংগ্রহে বিশেষ নম্বর দেওয়ার আগের বিধানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বিতর্কের আরেকটি দিক আর্থিক প্রভাব। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জনতা ব্যাংকে এখন প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার আমানত আছে। এর বিপরীতে ব্যাংকটির প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার নেতিবাচক স্থিতি রয়েছে। হিসাব করলে এই ঘাটতি মোট আমানতের প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে নেতিবাচক স্থিতি বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। তাই সংখ্যাটি ব্যাংকের কোন হিসাবের ঘাটতি, সেটি যাচাই করা দরকার।
তাঁদের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ আমানতের ধরন নিয়ে। দাবি করা হচ্ছে, ২০২৫ সালে পদোন্নতিতে বিশেষ নম্বরের আশায় কর্মকর্তারা যে আমানত সংগ্রহ করেছেন, তার বড় অংশই উচ্চ সুদের আমানত। বিশেষ সার্কুলারের মাধ্যমে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত নেওয়া হয়েছে। এসব আমানতের বিপরীতে ব্যাংক যে সুদে ঋণ দেয়, তা এর কাছাকাছি। ফলে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান, যাকে স্প্রেড বলা হয়, খুব কম। কোথাও কোথাও তা নেতিবাচকও হয়ে যাচ্ছে।
এই হিসাবটি সহজ ভাষায় বোঝা যায়। ব্যাংক আমানতকারীকে যে সুদ দেয় এবং ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে যে সুদ নেয়, এই দুইয়ের ব্যবধানই ব্যাংকের মূল আয়ের উৎস। আমানতের সুদ যদি ঋণের সুদের প্রায় সমান হয়, তাহলে ব্যাংকের হাতে লাভের জায়গা প্রায় থাকে না। ব্যবধান উল্টে গেলে প্রতিটি আমানত ব্যাংকের জন্য লোকসানের কারণ হয়। তাই আমানত বেশি জমা হওয়া সব সময় ভালো খবর নয়, কত খরচে জমা হলো সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখান থেকে প্রণোদনার প্রশ্ন ওঠে। কর্মকর্তারা যদি জানেন, যত বেশি আমানত আনবেন তত বেশি নম্বর পাবেন, তাহলে তাঁদের মনোযোগ যাবে পরিমাণের দিকে, খরচের দিকে নয়। ১২ শতাংশ সুদের আমানত আনা তুলনামূলক সহজ, কারণ চড়া সুদের লোভে গ্রাহক আসেন। কিন্তু সেই আমানত ব্যাংকের ব্যয় বাড়ায়। ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা ঠিক এ কথাই বলছেন। তাঁদের মতে, যে আমানত সংগ্রহে ক্ষতির ঝুঁকি আছে, তাকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হলে তা কর্মদক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন হয় না।
তাঁদের আশঙ্কা আরও একটি দিকে। এই ব্যবস্থায় যাঁরা কম খরচে আমানত সংগ্রহ করেন কিংবা ব্যাংকের প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করেন, তাঁরা পিছিয়ে পড়তে পারেন। আর যাঁরা চড়া সুদে আমানত আনেন, তাঁরা পান বাড়তি সুবিধা। এতে পদোন্নতিতে বৈষম্যের অভিযোগও উঠতে পারে। অর্থাৎ ভালো কাজের পুরস্কার ভুল মানুষের কাছে চলে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।
সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা জারির পর আগের সাংঘর্ষিক নির্দেশনা চালু রাখার কোনো সুযোগ থাকলে তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। না দিলে পর্ষদ সভায় ওই মেমো অনুমোদিত হলে তা নীতিমালার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করবে কি না, সেই প্রশ্নের সমাধানও জরুরি। তাঁরা এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জনতা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁদের অনুরোধ, পর্ষদ সভায় নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি আইন ও বিধিবিধানের আলোকে যাচাই করা হোক।
তবে এই সবই ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ও দাবি। প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বা মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে ব্যাংকের আগের সার্কুলার সত্যিই নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, মেমো আদৌ উত্থাপিত হয়েছে কি না এবং হলে পর্ষদ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা এখনো অজানা। এটাও বলা যায় না যে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের হাতে এ ব্যাপারে কোনো ভিন্ন ব্যাখ্যা নেই। যেমন, আগের সার্কুলারের আওতায় ২০২৫ সালের যে কাজ হয়েছে, তার মূল্যায়ন পুরোনো নিয়মেই হবে বলে যুক্তি দেওয়া হতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে দুই পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
এই ঘটনার বৃহত্তর তাৎপর্যও আছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো আগে থেকেই সংস্কারের চাপে আছে। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা এসব ব্যাংকের সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়ানোর কথা বলছেন। এমন সময়ে যদি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পদোন্নতি ব্যবস্থাই নীতিমালার সঙ্গে সংঘাতের অভিযোগে জড়ায়, তাহলে সংস্কারের গতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মন্ত্রণালয় সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য একই নীতিমালা করেছে যাতে স্বচ্ছ ও অভিন্ন মানদণ্ড থাকে। কোনো একটি ব্যাংক আলাদা পথে গেলে সেই অভিন্নতা ভেঙে পড়ে।
সব মিলিয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি নির্ভর করছে তিন ধাপের ওপর। প্রথমত, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান জানায় কি না। দ্বিতীয়ত, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি খতিয়ে দেখে কোনো নির্দেশনা দেয় কি না। তৃতীয়ত, পর্ষদ সভায় কী সিদ্ধান্ত হয়। এই তিনটির উত্তরেই বোঝা যাবে, এটি কেবল নীতির ব্যাখ্যাগত মতভেদ ছিল, নাকি সত্যিই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষার ঘটনা।

