দেশের আর্থিক খাতকে আরও নিরাপদ ও আধুনিক করতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, সাইবার হামলা এবং আর্থিক অনিয়ম মোকাবিলায় নেওয়া এই প্রকল্পটি এখন সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রকল্পটির নাম আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্প-২। বিশ্বব্যাংকের ৪০০ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংক এটি বাস্তবায়ন করবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকিং খাতের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নত করা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
প্রকল্পটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিভিন্ন সমস্যার কারণে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, কিছু ব্যাংকের দুর্বল পরিচালন ব্যবস্থা, তারল্য সংকট, মূলধন ঘাটতি এবং পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার অভাবে ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় সমস্যা তৈরি হয়। বিশেষ করে সাইবার হামলা, আন্তঃদেশীয় আর্থিক ঝুঁকি এবং বড় ধরনের অনিয়ম মোকাবিলায় সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যাংক সংস্কার এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে।
তার মতে, প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে এবং ২০১৬ সালের রিজার্ভ চুরির মতো বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধে সক্ষমতা বাড়বে।
প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা উন্নত করা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং আর্থিক খাতের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রম নেওয়া হবে।
এ ছাড়া দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, ব্যাংক সমাধান প্রক্রিয়া উন্নত করা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
আমানতকারীদের সুরক্ষার জন্য আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিলের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও থাকবে প্রকল্পে। পাশাপাশি ব্যাংক পুনর্গঠন ও সংকট ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমানে পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা এবং একীভূত তথ্য ব্যবস্থাপনার অভাব নিয়ন্ত্রকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে আমানতকারীদের আস্থা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
এই প্রকল্পটি এর আগে বাস্তবায়িত আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ। নতুন পর্যায়ে কার্যসম্পাদনভিত্তিক শর্তের মাধ্যমে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ব্যাংক সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
প্রকল্পের আওতায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে আমানত বীমা ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নয়নে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা চালু হলে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে। তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন, তথ্যের সঠিক ব্যবহার এবং ব্যাংকগুলোর সংস্কার কার্যক্রমের ওপর।

