পদ্মা ব্যাংকসহ দেশের কোনো ব্যাংক বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। আপাতত কোনো ব্যাংক বন্ধ করার পরিকল্পনাও নেই বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে ‘পদ্মা ব্যাংক বন্ধ হচ্ছে’ শিরোনামে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলেও সেটি বন্ধ করে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে আরিফ হোসেন খান বলেন, পদ্মা ব্যাংকসহ দেশের কোনো ব্যাংক বন্ধ করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নেয়নি, আপাতত তেমন পরিকল্পনাও নেই। তাঁকে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি সেটিকে সম্পূর্ণ ভুল প্রতিবেদন বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষ্য, এমন কথা তিনি বলেননি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুখপাত্র ব্যাখ্যা করে বলেন, কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হলে তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে কোনো ব্যাংকের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়া মানেই সেটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, বিষয়টি এমন নয়। তাঁর কথায়, শুধু পদ্মা ব্যাংক নয়, আরও কয়েকটি ব্যাংক নিয়েও এ ধরনের আলোচনা হয়েছে। সেই আলোচনার সূত্র ধরেই কোনো একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদ্মা ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তিনি এটিকে পুরোপুরি ভুল তথ্য আখ্যা দিয়ে বলেন, এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করা ঠিক হয়নি।
বন্ধের সিদ্ধান্ত না হলেও পদ্মা ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ ও মূলধন সংকটসহ বিভিন্ন আর্থিক সূচকে ব্যাংকটির দুর্বলতা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়েছিল। এর এক বছর আগে, অর্থাৎ আগের বছরের জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৫ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে খেলাপি ঋণের অঙ্ক আরও বেড়েছে, যা ব্যাংকটির সংকট এখনো কাটেনি বলেই ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। তবে এ ধরনের পর্যালোচনা কোনোভাবেই ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমতুল্য নয়। ফলে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য না বুঝে প্রকাশিত খবর আমানতকারীদের মধ্যে অকারণ উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
ব্যাংকটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে ‘ফারমার্স ব্যাংক’ নামে। কয়েক বছরের মধ্যেই নানা অনিয়ম ও আর্থিক সংকটে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। পরে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, মালিকানায় পরিবর্তন এবং নতুন করে মূলধন জোগানের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ফারমার্স ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পদ্মা ব্যাংক’।
নাম পরিবর্তনের পরও ব্যাংকটির আর্থিক সংকট পুরোপুরি কাটেনি। খেলাপি ঋণ, তারল্য পরিস্থিতি ও মূলধন ঘাটতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সময়ে সময়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এসব কারণে ব্যাংকটি বন্ধ বা অবসায়ন করা হবে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নেয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র।
ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল ব্যাংক নিয়ে গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক খবর আমানতকারীদের আস্থায় আঘাত হানতে পারে। এতে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতিও আরও জটিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সংবেদনশীল এই খাতের খবর প্রকাশে যাচাই-বাছাই ও দায়িত্বশীলতা জরুরি। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য দেওয়াও আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সহায়ক হবে।

