বিশ্বজুড়ে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ক্ষুদ্র ব্যবসার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কম অভিজ্ঞ কর্মীদের দ্রুত দক্ষ করে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থা বিশ্বব্যাংক। বড় কোনো অবকাঠামোগত মূলধন কিংবা জটিল সিস্টেমের পেছনে বিশাল অর্থ খরচ না করেও সস্তা ও সহজে ব্যবহারযোগ্য ‘স্মল এআই’ বা ছোট এআই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সাধারণ স্মার্টফোনের মাধ্যমেই ছোট ছোট ব্যবসা সম্প্রসারণের এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভার অংশ হিসেবে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বিশ্বমানের বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে ছড়াতে পারলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কেবল নতুন কাজের ক্ষেত্রই তৈরি হবে না, বরং সামগ্রিক কর্মসংস্থানের মানও বহুগুণ বাড়বে।
ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ‘স্মল এআই: মোর অ্যান্ড বেটার জবস’ শীর্ষক বৈশ্বিক আলোচনায় বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ ভ্যালেন্টিনা ক্যালদেরন-মেজিয়া জানান যে উন্নয়নশীল বিশ্বের সিংহভাগ মানুষ যেসব অনানুষ্ঠানিক কিংবা ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত, সেখানে সাশ্রয়ী এআই প্রযুক্তি এক নতুন রূপান্তর আনতে পারে। উদ্যোক্তারা খুব সহজেই দৈনন্দিন ইনভেন্টরি বা মালামালের মজুত ব্যবস্থাপনা, সাধারণ গ্রাহকসেবা প্রদান, পণ্যের ডিজিটাল মার্কেটিং এবং বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করতে এআই টুলস ব্যবহার করতে পারেন। এর প্রধান সুবিধা হলো, কম অভিজ্ঞ বা কম শিক্ষিত কর্মীরাও প্রযুক্তির সহায়তায় তুলনামূলকভাবে জটিল ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কাজ অনায়াসে সম্পাদন করতে সক্ষম হন। ফলে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কাজের গতি বা স্পিড অনেক বেড়ে যায় এবং পরিচালন খরচ কমে আসে।
তবে কেবল উৎপাদনশীলতা বাড়লেই যে জাদুকরী উপায়ে শত শত নতুন চাকরি তৈরি হয়ে যাবে, এমন ধারণা থেকে সতর্ক করেছেন বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকেরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রবর্তনের ফলে একদিক থেকে ব্যবসা সম্প্রসারণের কারণে নতুন লোকবলের কাজের সুযোগ তৈরি হলেও, অন্যদিকে কিছু চিরাচরিত কাজ স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড হয়ে যাওয়ার ফলে নির্দিষ্ট কিছু পদ বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়। বিশ্বব্যাংক মনে করে, এআইয়ের এই দ্বিমুখী প্রভাব সামাল দিতে হলে সরকারকে অবশ্যই সময়োপযোগী রি-স্কিলিং বা শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে নজর দিতে হবে। প্রযুক্তি গ্রহণ করার সাথে সাথে যদি কর্মীদের নতুন নতুন কাজ শেখানো যায়, তবেই কেবল কাজের সংখ্যা ও মান দুটিই একযোগে বৃদ্ধি পাবে।
অনলাইন প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষা খাতে এআই প্রযুক্তির বিতর্কিত ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন বিশ্বব্যাংকের আরেক বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ গোরিউনোভা। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে এআইয়ের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষকের জায়গা বা উপস্থিতি দখল করা নয়, বরং শিক্ষকদের দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করা। পাঠ পরিকল্পনা প্রস্তুত করা, শিক্ষার্থীদের শেখার ধরন বিশ্লেষণ করা এবং স্কুলের প্রশাসনিক কাগজপত্রের চাপ কমানোর মতো কাজে এআই দারুণ সহায়ক হতে পারে। তবে প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি দুর্বল রেখে কিংবা সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে একলাফে এআই ব্যবহারে হুট করে নামা বিপজ্জনক। বিশেষ করে শিশুদের মানসিক বিকাশ, স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই শিক্ষায় এআইপ্রযুক্তি চালুর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
দক্ষিণ আফ্রিকার এক প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ডাটা প্রাইভেসি এবং গোপনীয়তা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জটি তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞ সামীক্ষা খারে। তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের জন্য সম্পূর্ণ নিজস্ব বা একক ‘এআই সার্বভৌমত্ব’ গড়ে তোলা ভীষণ ব্যয়বহুল এবং এটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত বিভাজন বা ডিজিটাল ডিভাইড আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই কোটি কোটি টাকা খরচ করে নতুন ব্যবস্থা বানানোর চেয়ে শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা, আন্তর্জাতিক ওপেন স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা এবং যৌথ ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত। বিশ্বব্যাংকের এই বার্ষিক আলোচনার মূল বার্তা হলো, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক, এসএমই ও কৃষি খাতে প্রযুক্তি ছড়াতে হলে কেবল এআইয়ের স্বপ্ন দেখালেই চলবে না, বরং তথ্যের নিরাপত্তা রক্ষা ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে।

