বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমেছে, অন্যদিকে বিদেশে মুনাফা ও আয় পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এসব ব্যাংকের কর-পূর্ব মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময়ে বিদেশে অর্থ পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে ২৫ শতাংশেরও বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিদেশি ব্যাংকগুলোর কর-পূর্ব মুনাফা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। কর-পরবর্তী নিট মুনাফা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩২২ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংক খাতের দুর্বল সুশাসন এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো সতর্ক ঋণনীতি অনুসরণ করছে। এতে নতুন ঋণ বিতরণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের গতি কমছে।
২০২৬ সালের জুন শেষে দেশে কার্যরত নয়টি বিদেশি ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। বিপরীতে, ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বছরভিত্তিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশেরও নিচে ছিল।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৫ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে তা ২০২৬ সালের জুনে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে ঋণ লোকসানের বিপরীতে সংরক্ষণের অনুপাত ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭১ শতাংশ হয়েছে।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৩৯৫ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি।
এই আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অন্যদিকে, অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। তবে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ।
মুনাফা কমলেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তারল্যের অবস্থান শক্তিশালী রয়েছে। জুন শেষে তাদের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ৪১ শতাংশের বেশি। মোট সম্পদের প্রায় ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল তারল্যসম্পদ।
তারল্য আচ্ছাদন অনুপাত কমে প্রায় ৩৫০ শতাংশে দাঁড়ালেও তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার প্রায় সাড়ে তিন গুণ। স্থিতিশীল অর্থায়নের নিট অনুপাত বেড়ে হয়েছে ১৩৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হুসাইন খান জানিয়েছেন, বৈদেশিক বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক লেনদেন ও রপ্তানি অর্থায়নে বিদেশি ব্যাংকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে মুনাফা ও ঋণের মানের বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অন্যদিকে, সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরির মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বল সুশাসন, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিদেশি ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করছে।
সব মিলিয়ে, শক্তিশালী মূলধন ও পর্যাপ্ত তারল্য থাকা সত্ত্বেও মুনাফা হ্রাস এবং ঋণঝুঁকি বৃদ্ধি বিদেশি ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

