ধরুন, মাসে যার আয় ১০ হাজার টাকা, তাঁর চার হাজার টাকার বেশি যদি কিস্তিতেই বেরিয়ে যায়, বাকি ছয় হাজারে সংসার চলবে কীভাবে? বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) নতুন গবেষণা বলছে, গ্রামের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ ঋণগ্রহীতা পরিবারের মধ্যে এখন ৭৯ শতাংশ পরিবারকে আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি কিস্তিতে দিতে হচ্ছে। ২০১০ সালে এ হার ছিল ৪৯ শতাংশ। সব ঋণগ্রহীতা পরিবারকে একসঙ্গে হিসাব করলেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০১০ সালে এসব পরিবারের ২২ শতাংশ আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি কিস্তিতে দিত; এখন সেই হার বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। গবেষক কাজী ইকবাল ১২ অক্টোবর ঢাকার এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরেন। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গ্রামে ঋণ নেওয়া পরিবারের হার ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, ঋণ নেওয়া পরিবারের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি ঋণ শোধ করতে গিয়ে আয়ের বড় অংশ হারানোর চাপও বাড়ছে।
ঋণ আসলে কোথা থেকে আসছে
গ্রামের প্রতি চারটি ঋণের তিনটিই এখন আসছে এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে। গবেষণা অনুযায়ী এনজিওগুলোর ঘোষিত সুদ ১৫ শতাংশ, কিন্তু কার্যকর হারে তা প্রায় ২৭ শতাংশ। তুলনায় ব্যাংকঋণের গড় সুদ প্রায় ১০ শতাংশ, আর স্থানীয় মহাজনের কাছে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। গবেষকের মতে, ঋণদাতা বাড়লেও প্রতিযোগিতা সুদ কমাতে কাজে আসেনি, কারণ চড়া হারেও ঋণের চাহিদা বিপুল। এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে। ১৫ শতাংশ আর ২৭ শতাংশের মধ্যে এত ফারাক হয় কীভাবে? উত্তরটা পরের অংশে সহজ করে বলছি।
১৫ আর ২৭ এর ফারাকটা কোথায় লুকিয়ে
ফ্ল্যাট সুদ মানে সুদ হিসাব হয় পুরো ঋণের ওপর, শেষ কিস্তি পর্যন্ত। ধরুন আপনি ১০০ টাকা নিলেন, বছরে ১৫ টাকা সুদ, মোট ১১৫ টাকা কিস্তিতে ফেরত দিতে হবে। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে বা মাসে কিস্তি দিতে দিতে আপনার হাতে থাকা মূল ঋণের অংশ কমে যায়। শেষ দিকে হয়তো আপনার কাছে ১০ টাকাও নেই, অথচ সুদ ধরা হচ্ছে ১০০ টাকার ওপরই। কমতে থাকা বকেয়ার ওপর সুদ ধরলে, যাকে বলে ডিক্লাইনিং ব্যালান্স পদ্ধতি, সুদের আসল হার অনেক বেশি দাঁড়ায়। আমি নিজে হিসাব করে দেখেছি, ১৫ শতাংশ ফ্ল্যাট সুদের ঋণ ১২টি মাসিক বা ৫২টি সাপ্তাহিক সমান কিস্তিতে শোধ করলে কার্যকর বার্ষিক হার প্রায় ২৭ থেকে ২৮ শতাংশ হয়। তাই বিআইডিএসের ২৭ শতাংশের হিসাব অঙ্কের দিক থেকে অস্বাভাবিক নয়। একটা তথ্য আলাদা করে বলা দরকার। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমআরএ ২০১০ সালে সুদের সর্বোচ্চ সীমা ২৭ শতাংশ বেঁধে দেয় এবং ২০১৯ সালে তা কমিয়ে ২৪ শতাংশ করে। কর্মশালায় এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান ক্ষুদ্রঋণের সার্ভিস চার্জ ২৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন। বিআইডিএস যে প্রায় ২৭ শতাংশ বলছে, সেটা এই সীমার চেয়ে বেশি। কেন এই ফারাক, তা জানতে গবেষণার হিসাবের পদ্ধতি দেখা দরকার। আমার কাছে এর নিশ্চিত ব্যাখ্যা নেই, তাই অনুমান করে কিছু বলতে চাচ্ছি না।
এক ঋণ শোধ করতে আরেক ঋণ
সংখ্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চোখে লাগার মতো তথ্য সম্ভবত এটা। যাঁরা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একই সঙ্গে মহাজনের কাছ থেকেও ঋণ নেওয়া পরিবারের হার ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ শতাংশ হয়েছে। দুই বা তার বেশি ঋণ নেওয়া পরিবারের হারও ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৩ শতাংশ হয়েছে। দুটি হিসাব আলাদা, গুলিয়ে ফেলার সুযোগ আছে। প্রথমটি এনজিও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে মহাজনের ঋণ নেওয়ার হার, দ্বিতীয়টি সব ঋণগ্রহীতা পরিবারের হিসাব। কিস্তির টাকা ঠিক সময়ে জোগাড় করতে না পারলে বা জরুরি খরচ এলে অনেকে মহাজনের দ্বারস্থ হন, গবেষণায় এমন প্রবণতার কথা এসেছে। এতে সস্তা ঋণ শোধ করতে গিয়ে মানুষ ব্যয়বহুল ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। গবেষক কাজী ইকবালের ভাষায়, দরিদ্র মানুষ এক অন্তহীন ঋণচক্রে আটকা পড়ছে। তবে এটাও মনে রাখা দরকার, গবেষণায় ঋণের বোঝা কেন এভাবে বাড়ছে তার কারণ আলাদা করে খতিয়ে দেখা হয়নি।
কিস্তির ঘড়ি আর ফসলের ঘড়ি কেন মেলে না
এখানে আয়ের ধরন আর কিস্তির ধরনের অমিলটা বড় ব্যাপার। কৃষকের আয় আসে মৌসুম ধরে, আর এনজিওর কিস্তি আসে সাপ্তাহিক বা মাসিক ছন্দে। গবেষণা বলছে, ব্যাংক ও মহাজনের কৃষিঋণের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশে ফসল কাটার পর এককালীন বা বছরে একবার শোধের সুযোগ আছে। এনজিওর ঋণে এই সুযোগ মাত্র ৪ থেকে ৬ শতাংশে। এর পরিণতি ভারতে করা একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় দেখা গেছে। হার্ভার্ডের গবেষকদের সেই পরীক্ষায় যাঁরা সাপ্তাহিকের বদলে মাসিক কিস্তি দিয়েছেন, তাঁরা ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগার কথা জানিয়েছেন ৫১ শতাংশ কম। পরীক্ষাটি ছোট ছিল, অংশ নিয়েছিলেন ২১৩ জন ঋণগ্রহীতা, তাই একে সরাসরি বাংলাদেশের ওপর বসানো যাবে না। তবু ইঙ্গিতটা পরিষ্কার: কিস্তির সময়সূচি আয়ের সঙ্গে না মিললে মানসিক ও আর্থিক চাপ দুটোই বাড়ে। এর পাশাপাশি গ্রামীণ ঋণের মধ্যে কৃষির অংশ ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থনীতি বদলাচ্ছে, কিন্তু ঋণের কাঠামো সেই বদলের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
তাহলে কি ক্ষুদ্রঋণই সমস্যা?
এই প্রশ্নে সরলীকরণ করলে ভুল হবে। এমআরএর তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ খাতের সঞ্চিত উদ্বৃত্ত ২০০৬ সালের ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৬৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই ঋণ না থাকলে অনেক পরিবার আরও বেশি দামে মহাজনের কাছে যেত, এ কথাও সত্য। এমআরএ কর্মকর্তা নিজেও বলেছেন, সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো গেলে ঋণের খরচ কমানো সম্ভব। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবেও ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব নিয়ে পরীক্ষালব্ধ গবেষণার ছবি মিশ্র। ভারতের হায়দরাবাদে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, এস্থার ডুফলো ও সহকর্মীদের একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ বেড়েছিল, কিন্তু গড় ভোগব্যয়, স্বাস্থ্য বা শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন মেলেনি। মানে ঋণ নিজে জাদুকাঠি নয়। ঋণ থেকে আয় বাড়ছে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন, আর বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হকও কর্মশালায় ঠিক এ কথাই বলেছেন।
শুধু সুদ কমালেই কি হবে?
এই তথ্যগুলো পাশাপাশি রাখলে আমার কাছে তিনটি বিষয় স্পষ্ট মনে হয়। প্রথমত, সমস্যাটা শুধু সুদের হারের নয়, কিস্তির কাঠামোরও। সুদ কিছুটা কমলেও সাপ্তাহিক কিস্তির ছন্দ না বদলালে মৌসুমি আয়ের মানুষের চাপ পুরোপুরি কমবে না। দ্বিতীয়ত, বাজারে ঋণদাতা বেশি থাকলেই যে সুদ কমে, এই সরল ধারণা এখানে খাটেনি, কারণ গবেষণা অনুযায়ী চাহিদা এত বেশি যে চড়া হারেও ঋণ নেওয়ার লোক আছে। প্রতিযোগিতা তখনই কাজ করে যখন ঋণগ্রহীতা সহজে দাম তুলনা করতে পারেন এবং বিকল্প বেছে নিতে পারেন, আর সেই সুযোগ গ্রামের গরিব পরিবারের কাছে সীমিত। তৃতীয়ত, ৪০ শতাংশের হিসাবটা একটা সতর্কসংকেত, কোনো আইন নয়। কারও জন্য ৪০ শতাংশও সামলানো সম্ভব, আবার যাঁর আয় খুব কম, তাঁর জন্য ২০ শতাংশও ভারী হতে পারে। তবু সবচেয়ে গরিবদের ক্ষেত্রে এই হার ৭৯ শতাংশ পরিবারে ওঠা, আর দ্বিতীয় ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়া, দুটো মিলিয়ে সংকেতটা উপেক্ষা করার মতো নয়। এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে প্রশ্ন, ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি তার খরচ ও শর্ত নমনীয় করার দিকে কতটা এগোনো যায়। গবেষকেরা এমআরএকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে এবং কিস্তি ফসলের মৌসুমের সঙ্গে মেলাতে বলেছেন।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

