আর্থিক খাতে অনিশ্চয়তা ও পরিচালনাগত মুনাফায় টানাটানির প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা বা করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি বাজেটে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে মোট ১১৯ কোটি চার লাখ টাকা খরচ করেছে। আগের ছয় মাস অর্থাৎ গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বরের ১৯৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকার খরচের তুলনায় এই অঙ্ক অন্তত ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত ‘সিএসআর কার্যক্রমের ছয় মাসের পর্যালোচনা প্রতিবেদন’-এ উঠে এসেছে এই সিএসআর বাজেটের আশঙ্কাজনক সংকোচনের চিত্র।
প্রতিবেদনের খাতওয়ারি হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ব্যাংকগুলো তাদের সমাজসেবামূলক অর্থ বরাদ্দে সবচেয়ে বড় কাটছাঁট করেছে শিক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন সুরক্ষা খাতে। জানুয়ারি-জুন মেয়াদে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা আগের ছয় মাসের ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকার বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৪৫.৭৪ শতাংশ কম। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন খাতে মাত্র ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা আগের ষান্মাসিকের ২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকার অনুপাতে অর্ধেকেরও কম বা ৫৯.৯৯ শতাংশ কম। তবে এর বিপরীতে ‘অন্যান্য’ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এই ‘অন্যান্য’ বরাদ্দের বড় অংশই মূলত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নামে শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ ও সরকারি ত্রাণ তহবিলের সহায়তায় খরচ দেখানো হয়েছে।
সামাজিক উন্নয়ন ও তহবিল বরাদ্দে মূল অবদান ধরে রেখেছে মূলত বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। দেশের ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৩৩টি ব্যাংক মিলে ১০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা সিএসআর খাতে দিয়েছে, যা দেশের ব্যাংকগুলোর মোট সামাজিক খরচের ৮৭.১১ শতাংশ। বিপরীতে ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ২টি ব্যাংক মিলে অনুদান দিয়েছে অতি সামান্য ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অন্যদিকে দেশে ব্যবসারত ৯টি বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে ৬টি ব্যাংক সামাজিক খাতে ১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা বিতরণ করেছে। শরিয়াহভিত্তিক ১০টি ব্যাংক মোট ১৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা সিএসআর দেখালেও চমকপ্রদ তথ্য হলো; তাদের অর্জিত নিট মুনাফা থেকে মাত্র ৫ লাখ টাকা এসেছে, আর বাকি ৯৯.৭৪ শতাংশ অর্থই এসেছে অন্যান্য অপ্রাপ্তি উৎস বা খাত থেকে।
ব্যাংকের বাইরে দেশে কার্যরত ৩৫টি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান জানুয়ারি-জুন সময়ে সিএসআর খাতে মোট ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা খরচ করেছে। অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থাৎ ৪১.৮৫ শতাংশ সরাসরি গেছে সাধারণ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা এবং চিকিৎসা সহায়তা তহবিলে। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণের প্রভিশনিং সংক্রান্ত কঠোর নিয়মকানুন ও অনাদায়ী ঋণের চাপে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা বা অপারেটিং প্রফিট অনেকটাই কমে এসেছে। আয় বা প্রফিট মার্জিন কমায় ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে সিএসআর তহবিল ও অন্যান্য নন-অপারেটিং খরচ কমিয়ে দিচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের সুবিধাবঞ্চিত সমাজ ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের।

