বিশ্বব্যাংক গ্রুপের স্বল্প আয়ের দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা তহবিল ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনে (আইডিএ) এবার দাতার ভূমিকায় এসেছে মঙ্গোলিয়া। একসময় এই তহবিলের সহায়তা নেওয়া দেশটির সংসদ এখন তহবিলে ৪৮০ কোটি মঙ্গোলীয় তুগরিক দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। মার্কিন ডলারে এর পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে দেশটির এই যাত্রাকে তার উন্নয়ন-ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার ব্যাংকক থেকে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের পক্ষে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আইডিএর ২১তম পুনরর্থায়ন কর্মসূচিতে (আইডিএ২১) অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতায় নতুন ভূমিকা নিতে যাচ্ছে মঙ্গোলিয়া।
অঙ্কের হিসাবে এই অবদান বড় নয়। তবে এর প্রতীকী তাৎপর্য অনেক বেশি। কারণ, মঙ্গোলিয়া নিজেই একসময় আইডিএর সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে। ১৯৯১ সালে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সদস্য হওয়ার পর থেকে দেশটি মোট ১৬২ কোটি ডলারের বেশি উন্নয়ন অর্থায়ন পেয়েছে। এই অর্থ ব্যয় হয়েছে পরিবহন, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। ২০২০ সালের জুলাইয়ে মঙ্গোলিয়া আইডিএ থেকে উত্তরণ ঘটায়। এরপর থেকে দেশটি বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের (আইবিআরডি) আওতাভুক্ত গ্রাহক হিসেবে রয়েছে।
গত তিন দশকে মঙ্গোলিয়া দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়েছে এবং মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন তিন গুণ বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটি উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করে। এই অগ্রগতির পথ ধরেই এখন তারা সহায়তা গ্রহণের অবস্থান থেকে সহায়তা প্রদানের অবস্থানে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে কী অর্জন সম্ভব, তারই উদাহরণ।
দেশটির অর্থমন্ত্রী মেন্দসাইখান জাগদজাভ বলেন, আইডিএ২১-এ মঙ্গোলিয়ার অবদান বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সংহতির প্রতি দেশটির অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তিনি জানান, আইডিএর সহায়তা সরাসরি পাওয়ায় মঙ্গোলিয়া বুঝেছে, দারিদ্র্য কমানো, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে সহজ শর্তের অর্থায়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি অন্য দেশকে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পেরে মঙ্গোলিয়া গর্বিত বলেও জানান তিনি।
বিশ্বব্যাংকের অংশীদারত্ব, উদ্ভাবন ও সম্পদ সংগ্রহবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট লিসা ফিনেরান আইডিএর দাতা গোষ্ঠীতে মঙ্গোলিয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মঙ্গোলিয়ার উন্নয়ন-অগ্রগতি দেখিয়েছে, ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে কী অর্জন সম্ভব। অন্য দেশগুলোর সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য মঙ্গোলিয়ার এই অঙ্গীকারের কারণে বিশ্বব্যাংক কৃতজ্ঞ।
আইডিএ বিশ্বব্যাংক গ্রুপের এমন একটি তহবিল, যা ৭৮টি স্বল্প আয়ের দেশকে অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণ দেয়। দারিদ্র্য কমানো, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এ তহবিলের প্রধান লক্ষ্য। প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্গঠন ও নতুন অবদানের মাধ্যমে এর অর্থের সংস্থান করা হয়। আইডিএ২১ কর্মসূচি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত হয়েছে। বর্তমানে সংস্থাটি ৭৮টি দেশে উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়ন করছে।
এই ঘটনার তাৎপর্য শুধু অর্থের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রে সাধারণত ধনী দেশগুলোই প্রধান দাতা। সেখানে এক সময়ের সহায়তাগ্রহীতা দেশ যখন নিজেই অবদান রাখতে শুরু করে, তখন সেটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয়। এতে দেখা যায়, সহজ শর্তের অর্থায়ন সঠিকভাবে কাজে লাগলে একটি দেশ সহায়তা-নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারে।
আইডিএর উত্তরণ-প্রক্রিয়ার সাফল্যের দৃষ্টান্ত হিসেবেও মঙ্গোলিয়ার এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। সহায়তা নিয়ে উত্তরণের পর আবার দাতা হওয়ার ঘটনা তুলনামূলক বিরল। এ কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি অনুপ্রেরণা হতে পারে। তবে বিজ্ঞপ্তিতে মঙ্গোলিয়ার এই অর্থ কীভাবে ও কত কিস্তিতে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়নি।

