দেশে ইন্টারনেট সংযোগের সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত, মোবাইল ফোনের ব্যবহারও পৌঁছেছে প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির আড়ালেই রয়ে গেছে একটি বৈপরীত্য; ব্যক্তি পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়লেও পরিবার পর্যায়ে ইন্টারনেট সুবিধা থাকার হার কমেছে। কম্পিউটার ব্যবহারেও তেমন অগ্রগতি নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পরিসংখ্যানে দেশের ডিজিটাল সংযোগের এই চিত্র উঠে এসেছে।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট; এই আট মাসে দেশে ইন্টারনেট গ্রাহকসংযোগ বেড়েছে ৮৬ লাখ ৭০ হাজার। জানুয়ারিতে মোট সংযোগের সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার, আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজারে। একই সময়ে ইন্টারনেট পেনিট্রেশন বা জনসংখ্যার তুলনায় সংযোগের হার ৭৩ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ হয়েছে। তবে এখানে একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: বিটিআরসির গ্রাহকসংযোগের হিসাবকে সরাসরি স্বতন্ত্র ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বলা যায় না, কারণ একজন ব্যক্তির একাধিক সিম বা সংযোগ থাকতে পারে।
মোবাইল ইন্টারনেটই এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি। জানুয়ারিতে মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ ছিল ১১ কোটি ৪২ লাখ ২০ হাজার, আগস্টে তা বেড়ে ১২ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও পাবলিক সুইচড টেলিফোন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড সংযোগ ১ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার থেকে বেড়ে ১ কোটি ৫৪ লাখে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ স্থির ব্রডব্যান্ডের তুলনায় মোবাইল নেটওয়ার্ক এখনো দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রধান মাধ্যম। একই সময়ে মোট মোবাইল গ্রাহকসংযোগ ১৮ কোটি ৫৮ লাখ থেকে বেড়ে ১৯ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার হয়েছে।
বিবিএসের ‘আইসিটি ব্যবহার ও প্রয়োগ জরিপ ২০২৫-২৬’-এর চতুর্থ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বেড়ে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৫৫ শতাংশ। একইভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর হার ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। নিজস্ব মোবাইল ফোনের মালিকানাও ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে ফোন ব্যবহারকারী আর নিজস্ব ফোনের মালিক; এই দুই শ্রেণি এক নয়; জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহারকারীদের একটি অংশ অন্যের ফোন ব্যবহার করেন।
পরিবার পর্যায়ের তথ্যেই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বিবিএসের হিসাবে, ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুনে ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ছিল; ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবহার বাড়লেও সব পরিবারের মধ্যে ইন্টারনেট সুবিধার বিস্তার একই গতিতে এগোয়নি। স্মার্টফোনে প্রবেশাধিকার সামান্য বেড়ে ৭৫ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। প্রায় ৯৯ শতাংশ পরিবারের কাছে অন্তত একটি মোবাইল ফোন রয়েছে; যা দেখায়, দেশের ডিজিটাল সংযোগ মূলত মোবাইলনির্ভর হয়ে উঠেছে।
কম্পিউটার ব্যবহারের চিত্র আরও সীমিত। বিবিএসের জরিপে ব্যক্তি পর্যায়ে কম্পিউটার ব্যবহারের হার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে, কম্পিউটার রয়েছে এমন পরিবারের হার ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ল্যান্ডলাইন টেলিফোনের ব্যবহারও কমছে; সর্বশেষ প্রান্তিকে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারে ফিক্সড-লাইন টেলিফোন ছিল, আগের বছর যা ছিল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, সংযোগের বিস্তার ঘটলেও কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবহার এবং পরিবারের বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সুবিধায় অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর।
মোবাইল নেটওয়ার্কেও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন চলছে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টে থ্রিজি গ্রাহকসংযোগ ২১ লাখ ২০ হাজার থেকে কমে ১০ লাখ ৫০ হাজারে নেমেছে। একই সময়ে ৪জির ব্যবহার বেড়েছে। থ্রিজি থেকে ৪জিতে এই পরিবর্তন দ্রুতগতির মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার নির্দেশ করে। তবে ইন্টারনেট সংযোগ বাড়লেই যে প্রত্যেক পরিবারে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল সেবা পৌঁছে যাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বিবিএসের এই জরিপে প্রতি প্রান্তিকে দেশের ৬৪ জেলার ২ হাজার ৫৬৮টি নমুনা এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি এলাকায় ২৪টি করে পরিবার অন্তর্ভুক্ত থাকায় প্রতি প্রান্তিকে ৬১ হাজার ৬৩২টি পরিবার জরিপের আওতায় আসে; বছরে মোট নমুনা পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৮। কম্পিউটার-সহায়তায় সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে পরিচালিত এই জরিপে প্রথমবারের মতো জেলাভিত্তিক প্রাক্কলনও তৈরি করা হয়েছে। এর তথ্য দেশের আইসিটি নীতি প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে প্রতিবেদন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করা হবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের ডিজিটাল সংযোগ বাড়ছে; বিশেষ করে মোবাইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবারে ইন্টারনেটের সুযোগ, কম্পিউটার ব্যবহারের হার এবং প্রযুক্তির কার্যকর প্রবেশাধিকার বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ডিজিটাল অগ্রগতির প্রকৃত মূল্য শুধু কতটি সংযোগ চালু আছে, তা দিয়ে নয়; বরং কত মানুষ ও পরিবার সেই সংযোগ ব্যবহার করে শিক্ষা, কাজ, ব্যবসা এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারছে, তা দিয়েও বিচার করতে হয়।

