সরকারের বাড়তি ঋণচাহিদার সঙ্গে ব্যাংক খাতের তারল্যচাপ যুক্ত হয়ে সরকারি ঋণ নেওয়ার খরচ আবার বাড়িয়ে দিয়েছে। গত সপ্তাহে ট্রেজারি বিলের ইল্ড ৮ শতাংশের নিচে নেমে আসার পর রোববারের নিলামে তিন মেয়াদের বিলেই তা আবার বেড়েছে। এর পেছনে একটি বড় ঘটনা হলো, আর্থিক সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংককে তিন মাসের জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ নিশ্চয়তা থাকলেও বিপুল অঙ্কের অর্থ অন্য ব্যাংককে দেওয়ায় সোনালীর নিজের ব্যবহারযোগ্য তারল্যে চাপ তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের চাহিদাও বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউ এজ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নিলামের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের কাট-অফ ইল্ড এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ হয়েছে। ১৮২ দিন মেয়াদি বিলের ইল্ড ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের ইল্ড ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ, তিন মেয়াদেই এক সপ্তাহে ইল্ড বেড়েছে প্রায় ০.৮ থেকে ০.৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। ১৮ অক্টোবরের নিলামে সরকার মোট ১০ হাজার কোটি টাকা তোলার পরিকল্পনা করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, এর মধ্যে ৯১ দিন মেয়াদি বিলে ৫ হাজার কোটি, ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ৩ হাজার কোটি এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে ২ হাজার কোটি টাকা তোলার কথা ছিল।
সোনালী ব্যাংক ১৩ অক্টোবর ন্যাশনাল ব্যাংককে তিন মাসের জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়। ঋণটির সুদের হার ১০ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এর শতভাগ পরিশোধের নিশ্চয়তা দিয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তা পরিশোধ করার কথা। এ অর্থের উদ্দেশ্য ছিল ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা তোলার চাহিদা মেটানো এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা। তবে ঋণটির পরিশোধের নিশ্চয়তা থাকলেও সোনালী ব্যাংকের হাতে থাকা নগদ অর্থের একটি বড় অংশ তিন মাসের জন্য অন্য ব্যাংকের কাছে চলে গেছে। ফলে নিজস্ব তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয় এবং সোনালী ব্যাংককে কলমানি বাজার থেকে অর্থ ধার করতে হয়েছে। সাধারণত সোনালী ব্যাংক আন্তব্যাংক বাজারে বড় ঋণদাতা এবং সরকারি সিকিউরিটিজের উল্লেখযোগ্য ক্রেতা হিসেবে পরিচিত।
এই চাপ আরও বেড়েছে দীর্ঘ ছুটির আগে ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থ ধরে রাখার চাহিদায়। দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কথা। এ সময় গ্রাহকদের উত্তোলনের চাহিদা মেটানো এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে ব্যাংকগুলো হাতে পর্যাপ্ত তারল্য রাখতে চাইছে। ফলে অন্য ব্যাংককে ঋণ দেওয়ার বা সরকারি বিল কেনার আগে নিজেদের নগদ অর্থের অবস্থাও হিসাব করতে হচ্ছে। ট্রেজারি বিলের নিলামে ব্যাংকগুলোর দরপ্রস্তাবের ওপর এ ধরনের তারল্য পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে পারে। ব্যাংকগুলো যখন অর্থের জন্য বেশি প্রতিযোগিতা করে অথবা আগের মতো বিনিয়োগ করতে পারে না, তখন সরকারকে অর্থ সংগ্রহের জন্য তুলনামূলক বেশি ইল্ড দিতে হতে পারে।
সরকারের বাড়তি ঋণচাহিদাও ইল্ড বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ব্যয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয়, রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এবং বিদেশি ঋণপ্রাপ্তির তুলনায় বেশি ঋণ পরিশোধের প্রয়োজন সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে দৈনন্দিন ব্যয় ও অন্যান্য দায় মেটাতে সরকারকে দেশীয় ব্যাংকনির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকার নিট ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ধার করেছে। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে সরকার ব্যাংক খাতকে নিট ৬ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছিল। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম তিন মাসেই সেই লক্ষ্যের প্রায় ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে।
ট্রেজারি বিল মূলত সরকারের স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়ার একটি মাধ্যম। সরকার যখন বিল নিলামে ছাড়ে, ব্যাংক ও অন্যান্য বিনিয়োগকারী নির্দিষ্ট ইল্ডে তা কেনার প্রস্তাব দেন। ইল্ড বেড়ে গেলে সরকারকে ঋণ সংগ্রহের জন্য তুলনামূলক বেশি সুদ দিতে হয়, ফলে ভবিষ্যতে সরকারি ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই সময়ে ব্যাংকগুলো যদি তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বেশি অর্থ রাখে, তাহলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঋণযোগ্য অর্থের প্রাপ্যতা সীমিত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। তবে ট্রেজারি বিলের ইল্ড বাড়লেই সব ব্যাংকঋণের সুদ একই হারে বেড়ে যাবে, এমন নয়; ঋণগ্রহীতার ঝুঁকি, ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের খরচ এবং ঋণের মেয়াদও সেখানে ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে ট্রেজারি বিলের ইল্ড বৃদ্ধিকে শুধু সোনালী ব্যাংকের ন্যাশনাল ব্যাংককে দেওয়া ঋণের ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এই ঋণ সোনালীর তারল্যে চাপ তৈরি করেছে, ছুটির আগে ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতা বাড়িয়েছে এবং একই সময়ে সরকারের ঋণচাহিদাও বেড়েছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকারের রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান কতটা কমানো যায় এবং ব্যাংক খাতে তারল্যের চাপ কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়। তা না হলে দেশীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ধার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের খরচও উঁচুতে থাকার ঝুঁকি থাকবে।

