এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবার বেড়েছে সরকারি ঋণ নেওয়ার অন্যতম মাধ্যম ট্রেজারি বিলের সুদহার। রোববারের নিলামে স্বল্পমেয়াদি এই বিলের সুদহার সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে উঠেছে বলে সমকালের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নিলামের মাধ্যমে সরকার মোট ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এর পেছনে ব্যাংকগুলোর তারল্যের পরিবর্তন, বড় অঙ্কের ঋণ লেনদেন এবং সরকারের বাড়তি অর্থের চাহিদাকে কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যাংকাররা। সুদহার বাড়ার অর্থ শুধু সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়া নয়, বরং ব্যাংকগুলো সরকারি ঋণপত্রে টাকা রাখাকে কতটা আকর্ষণীয় মনে করছে, তারও একটি ইঙ্গিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে গড়ে ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ সুদে। আগের সপ্তাহে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে তিন হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে গড়ে ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ সুদে, যা আগের সপ্তাহের ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। আর ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের সুদহার ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ তিন মেয়াদের বিলেই সুদ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিলাম ক্যালেন্ডারেও ১৮ অক্টোবরের নিলামে মোট ১০ হাজার কোটি টাকা তোলার পরিকল্পনা দেখা যায়।
স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত টাকা থাকলে সরকারি ঋণপত্র কেনার প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে, ফলে সরকার তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকায় ট্রেজারি বিলের সুদহার ৮ শতাংশের নিচে নেমেছিল বলে ব্যাংকারদের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাজারে তারল্য থাকলেই যে সব সময় সুদ কমবে, তা নয়। কোন ব্যাংকের হাতে কত টাকা আছে, সেই অর্থ কত দিন ধরে রাখতে পারবে এবং অন্য কোথায় বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেজারি বিলের বড় ক্রেতা সোনালী ব্যাংক গত সপ্তাহে ন্যাশনাল ব্যাংককে সাত হাজার কোটি টাকা ধার দেওয়ার পর তারল্যের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সামগ্রিকভাবে টাকা থাকলেও বড় অঙ্কের অর্থ এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে চলে গেলে সরকারি ঋণপত্র কেনার জন্য নির্দিষ্ট ব্যাংকের হাতে থাকা অর্থ কমে যেতে পারে। নিলামে সুদহার নির্ধারণের সময় এই বাস্তবতাও প্রভাব ফেলে।
সুদহার বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে সামনে এসেছে সরকারের অর্থের চাহিদা। সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে বকেয়া অর্থও পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। এই ব্যয় মেটাতে চলতি মাসে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অর্থের সবটাই নতুন ব্যয় মেটাতে যাবে না; এর একটি বড় অংশ পুরোনো ঋণ সমন্বয়সহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
সরকার যখন ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিতে চায়, তখন সেই ঋণের জন্য ব্যাংকগুলোর কাছে আকর্ষণীয় শর্ত তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিলামে সরকার যে সুদ দিতে রাজি থাকে এবং ব্যাংকগুলো যে সুদে টাকা দিতে চায়, তার সমন্বয়েই চূড়ান্ত হার নির্ধারিত হয়। ফলে সরকারি ঋণের চাহিদা বাড়লে সুদ বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে, যদিও তা একমাত্র কারণ নয়। তারল্যের অবস্থা, ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং বাজারের প্রত্যাশাও এখানে ভূমিকা রাখে।
ট্রেজারি বিল হলো সরকারের স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়ার একটি মাধ্যম। ব্যাংক ও অন্যান্য বিনিয়োগকারী এসব বিল কিনে সরকারকে অর্থ দেয়, আর নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সরকার বিলের মূল্য পরিশোধ করে। সরকার সাধারণত বিলের অভিহিত মূল্যের চেয়ে কম দামে এটি বিক্রি করে; সেই দামের পার্থক্য থেকেই বিনিয়োগকারীর আয় নির্ধারিত হয়। তাই এখানে প্রকাশিত সুদহারকে ব্যাংকঋণের সুদের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক নয়।
তবে ট্রেজারি বিলের সুদহার দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে সরকারি ঋণের ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো যদি তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগ থেকে ভালো আয় পায়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্তেও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণের খরচ কমানো যখন গুরুত্বপূর্ণ, তখন সরকারি ঋণের চাহিদা ও বেসরকারি ঋণের প্রবাহের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। অবশ্য ট্রেজারি বিলের সুদ বাড়লেই বেসরকারি ঋণ কমবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ ও তারল্যের সামগ্রিক তথ্যও দেখতে হবে।
সাম্প্রতিক নিলামে সুদহার বাড়ার ঘটনাটি তাই শুধু একটি সুদের সংখ্যার পরিবর্তন নয়। সরকারের অর্থের চাহিদা, ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অর্থের ব্যবহার এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের মধ্যে সম্পর্কটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী নিলামগুলোতে সুদহার কোন দিকে যায়, সেটি বোঝার জন্য সরকারি ঋণের চাহিদা ও ব্যাংক খাতের তারল্যের পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে হবে।

