রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগে অভিজ্ঞতার একটি শর্ত শিথিল করার সুযোগ রেখে নতুন নীতিমালা জারি করেছে সরকার। বিশেষ দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সুনাম থাকলে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা ছাড়াও এখন কাউকে এমডি পদে বিবেচনা করা যাবে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক পদে মনোনয়ন, নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। এর মধ্য দিয়ে গত ২৬ জুলাই জারি করা আগের নীতিমালাটি বাতিল হয়ে গেছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি বা সিইও হতে হলে প্রার্থীকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় কর্মকর্তা হিসেবে অন্তত ২০ বছর কাজ করতে হবে। সেই সঙ্গে আরেকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। হয় তাঁকে বর্তমানে বা অতীতে কোনো ব্যাংকের এমডি বা সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, অথবা এমডি পদের ঠিক আগের পদে কমপক্ষে দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এই শেষ শর্তটিই এখন বিশেষ ক্ষেত্রে শিথিল করা যাবে। ফলে ডিএমডি হিসেবে দুই বছর কাজ না করলেও যোগ্য কর্মকর্তারা এমডি পদের জন্য বিবেচিত হতে পারবেন।
শিথিলতার এই সুযোগ অবশ্য সবার জন্য খোলা নয়। বিশেষ দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সুনামের মতো বিষয়গুলো প্রমাণ করতে পারলেই কেবল এই সুবিধা মিলবে। নীতিমালায় এসব বিষয় কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। ফলে বাছাই কমিটির বিবেচনা এখানে বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে নীতিমালায় বেশ কড়া অবস্থান রাখা হয়েছে। এমডি পদের প্রার্থীকে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিতে হবে। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি থাকলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। একই সঙ্গে চাকরিজীবনের সব পর্যায়ে সততা, সুনাম ও সন্তোষজনক কর্ম-রেকর্ড থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে প্রার্থীর প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিষয়ে প্রার্থীর পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার এই সময়ে সাইবার হামলা ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি মোকাবিলায় এই দক্ষতাকে অপরিহার্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও নতুন কিছু ধাপ যুক্ত হয়েছে। বাছাই কমিটির সুপারিশের পাশাপাশি প্রার্থীর গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদন পর্যালোচনার বিধান রাখা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে প্রার্থী মনোনীত হবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতি নিয়ে তাঁকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেবে।
এমডি পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর। প্রয়োজন হলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশের ভিত্তিতে পুনর্নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে।
তবে অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিলের সুযোগ সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি পদে শর্ত আগের মতোই রাখা হয়েছে। সেখানে এমডি হতে হলে ডিএমডি পদে কমপক্ষে দুই বছরের অভিজ্ঞতা লাগবে। পাশাপাশি নবম গ্রেড থেকে অন্তত ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতাও থাকতে হবে। অর্থাৎ শিথিলতার সুবিধা শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
নীতিমালা জারির সময়টিও আলোচনায় এসেছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এমডি পদে বড় ধরনের রদবদল হয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) ও বেসিক ব্যাংকের এমডিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে সরকার। এরপর থেকে এসব পদে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ গত সোমবার সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের এমডিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এর বাইরে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এমডি পদেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে আলোচনা চলছে।
এ অবস্থায় অনেক ব্যাংকের শীর্ষ পদ এখন শূন্য বা শূন্য হতে যাচ্ছে। নতুন নীতিমালায় শর্ত কিছুটা শিথিল হওয়ায় নিয়োগের পরিধি বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে গোয়েন্দা ও দুদকের প্রতিবেদন যাচাই, শিক্ষাগত রেকর্ড ও সততার ওপর জোর দেওয়ায় নিয়োগে কড়াকড়িও বজায় থাকছে। কাকে এই পদে বসানো হবে এবং বিশেষ দক্ষতার মানদণ্ড কীভাবে প্রয়োগ হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে নতুন নীতিমালার সফলতা।

