নগদ টাকার বদলে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে বিপুল ব্যয় বাঁচানো সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণা বলছে, নগদ লেনদেনে বছরে যে খরচ হয়, ডিজিটাল লেনদেনে তা প্রায় ২৮ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ নগদ লেনদেনের ব্যয় ডিজিটালের তুলনায় প্রায় ২৮ গুণ বেশি। ‘দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট’ শীর্ষক এই গবেষণার তথ্য বাসসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে নগদ লেনদেনের বার্ষিক ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা ওই বছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। একই সময়ে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ। মাথাপিছু হিসাবেও ব্যবধান বড়। নগদ লেনদেনে বছরে একজনের ব্যয় ৯ হাজার ৯৩৮ টাকা, আর ডিজিটালে মাত্র ৩৪৮ টাকা।
নগদ ব্যবস্থাপনার খরচ কোথায় কোথায় হয়, তা-ও গবেষণায় ভাগ করে দেখানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে নগদ লেনদেনের কারণে বছরে প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। ভোক্তাদের বার্ষিক ব্যয় ২৮ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নগদ ব্যবস্থাপনা খরচ বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে আছে মুদ্রা ছাপানো ও বিতরণ, অর্থ পরিবহন ও নিরাপত্তা, ব্যাংক শাখা ও এটিএম বুথ পরিচালনা এবং টাকা তোলা, বহন ও ব্যবহারে মানুষের ব্যয় করা সময়ের মূল্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য ব্যয় জড়িত। নোট ছাপানোর কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে ছাপা, পরিবহন ও বাজারে প্রচলন বজায় রাখা পর্যন্ত নানা খরচ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বহন করতে হয়। নিয়মিত ব্যবহারে নোট পুরোনো ও ছেঁড়া হয়ে গেলে নতুন নোট ছাপাতে হয়, ফলে এই ব্যয় বারবার তৈরি হয়। তাঁর মতে, ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে এসব ব্যয় কমানো সম্ভব। লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় দুর্নীতি, চুরি ও অর্থের অপব্যবহার কমাতেও এটি সহায়তা করতে পারে।
গবেষণায় ছায়া অর্থনীতির প্রভাবও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ছায়া অর্থনীতির কারণে সরকার বছরে ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাতে পারে। এটি জিডিপির ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং নগদ লেনদেনের মোট আনুমানিক ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। রাজস্ব হারানোর এই অংশ হিসাবের বাইরে রাখলেও নগদ লেনদেনের ব্যয় ডিজিটালের চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি থাকে।
তবে ডিজিটাল লেনদেনও সমস্যামুক্ত নয়। গবেষণা বলছে, এই ব্যবস্থায় বছরে আনুমানিক আয় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, অথচ পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যবস্থাটি সস্তা হলেও আর্থিকভাবে নিজের খরচ নিজে তুলতে পারছে না।
ডিজিটাল লেনদেন ছড়িয়ে পড়ার পথে বাধাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বেশি মাশুল নেওয়া, লেনদেনের অর্থ নিষ্পত্তিতে দেরি, বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং ইন্টারনেট সংযোগের অনির্ভরযোগ্যতা। এ ছাড়া প্রতারণা, লেনদেন ব্যর্থ হওয়া, ভুল হিসাবে টাকা চলে যাওয়া এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার ঘাটতির কারণে অনেক গ্রাহক ও ব্যবসায়ী ইলেকট্রনিক লেনদেনে আগ্রহী হচ্ছেন না।
মোবাইল আর্থিক সেবা ও ইলেকট্রনিক অর্থ স্থানান্তরের প্রসার ঘটলেও লেনদেনে নগদের আধিপত্য এখনো প্রবল। গবেষণা বলছে, বিভিন্ন ধরনের লেনদেনের মোট সংখ্যার ৮০ শতাংশের বেশি এখনো নগদে হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। তাঁদের মুনাফা এমনিতেই কম, ফলে ডিজিটাল লেনদেনের বাড়তি মাশুল সেই মুনাফা আরও কমিয়ে দিতে পারে। লেনদেনের পদ্ধতি, অর্থ হাতে পেতে কত সময় লাগবে এবং কত খরচ হবে, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে স্পষ্ট তথ্য থাকা জরুরি। ভোক্তাদের জন্য ডিজিটাল লেনদেন সময় ও শ্রম বাঁচায় এবং লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের সুবিধা দেয়। তবে আস্থা বাড়াতে নির্ভরযোগ্য সেবা, সহজে অভিযোগ জানানো ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং প্রতারণা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণাটি তৈরি করা হয়েছে ডেস্কভিত্তিক গবেষণা, পেমেন্ট ব্যবস্থার তথ্য ও নীতিমালা পর্যালোচনা, ২১টি সাক্ষাৎকার এবং পাঁচটি দলভিত্তিক আলোচনার ভিত্তিতে।
আন্তসংযোগযোগ্য ডিজিটাল লেনদেন উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয় মানদণ্ড হিসেবে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করেছে। ব্যবসায়ীদের কাছে এটি আরও আকর্ষণীয় করতে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে উদ্যোগটি কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে ব্যবস্থাটি ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের কাছে কতটা সাশ্রয়ী, সুবিধাজনক ও নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে তার ওপর।
গবেষণার সুপারিশ, শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়লেই চলবে না। সাশ্রয়ী সেবা, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, সহজে ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। নগদনির্ভরতা থেকে ডিজিটালে যেতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। এর মধ্যে গ্রাহক সুরক্ষা জোরদার করা, পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগ বাড়ানো, অর্থ নিষ্পত্তির বিলম্ব দূর করা এবং ডিজিটাল লেনদেনে মানুষের দক্ষতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট। ডিজিটাল লেনদেনে সাশ্রয়ের সম্ভাবনা বিশাল, কিন্তু ব্যবসায়ী ও গ্রাহকের আস্থা এবং মাশুলের প্রশ্নে সমাধান না এলে নগদের আধিপত্য ভাঙা কঠিন। ডিজিটাল ব্যবস্থার নিজস্ব আয়-ব্যয়ের ঘাটতিও দীর্ঘমেয়াদে সেবাদাতাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। ফলে মাশুল কমানো ও টেকসই ব্যবসায়িক মডেল, দুটোর মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করাই নীতিনির্ধারকদের বড় পরীক্ষা।

