একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড তার আর্থিক খাত, যার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ব্যাংকিং ব্যবস্থা। মানুষের সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তর করা, শিল্পের সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ভূমিকা অপরিসীম।
অথচ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিনের সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং অর্থ পাচারের ঝুঁকিতে গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এর প্রভাব এখন আর ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার, সরকারি অর্থব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের নিরাপত্তার ওপরও পড়ছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতের পূর্ববর্তী অনিয়ম অনুসন্ধান, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০২৬ সালের পরিস্থিতি সেই সংস্কারের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব তথ্য আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি প্রতিষ্ঠার জরুরি প্রয়োজন তুলে ধরে।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দুর্বল তদারকি, ঋণ অনুমোদনে প্রভাব বিস্তার এবং জবাবদিহির সীমাবদ্ধতার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি। একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের প্রধান দায়িত্ব হলো আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঋণ বিতরণে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা যদি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে ব্যাংক ক্রমেই তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মালিকানার কেন্দ্রীভবন, পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতার ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন, জামানতের মূল্যায়নে দুর্বলতা এবং ঋণ বিতরণের পর অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণে ব্যর্থতা আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে।
এ পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেনামি ঋণ ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা গোপন রেখে একাধিক কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ করা হলে ব্যাংকের পক্ষে ঋণগ্রহীতার সামগ্রিক ঝুঁকি নিরূপণ কঠিন হয়ে পড়ে। একই গোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণ করা হলেও অর্থের প্রকৃত ব্যবহার ও পরিশোধের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই না করলে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা ও তদারকির সক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব, ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শিথিলতা এবং আর্থিক তথ্যের যথাযথ প্রকাশ না হলে জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকিকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান সূচক খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। জুন শেষে মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩৫.৭৩ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের জুনের মূল্যায়নে মার্চ শেষে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২.৬ শতাংশ উল্লেখ করা হয়, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ছিল ৭.৯ শতাংশ। একই মূল্যায়নে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে নেমে যাওয়ার তথ্য উঠে আসে। এসব সূচক ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তবে খেলাপি ঋণের অনুপাত এবং মোট পরিমাণের মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। ঋণের শ্রেণিবিন্যাস কঠোর হলে আগে আড়ালে থাকা অনাদায়ী ঋণ প্রকাশ পেতে পারে। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া সব সময় নতুন করে একই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ নয়; এর একটি অংশ হতে পারে পূর্ববর্তী অনিয়ম ও ক্ষতির প্রকৃত হিসাব প্রকাশের ফল।
সংকটটি আবার সব ব্যাংকে সমানভাবে বিস্তৃত নয়। ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। এই কেন্দ্রীভবন ইঙ্গিত দেয় যে কয়েকটি বড় ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের দুর্বলতা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাপ সৃষ্টি করছে।
খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের সুদ আয় কমে, ঋণের সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে বেশি অর্থ সংরক্ষণ করতে হয় এবং মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যখন কার্যকর অর্থায়ন পান না, তখন উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকের আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অর্থ পাচারের কৌশল: বাণিজ্য থেকে আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক। ব্যাংকিং খাতের সংকটের সঙ্গে অর্থ পাচারের সম্পর্ক গভীর হলেও দুটি বিষয়কে এক করে দেখা উচিত নয়। খেলাপি ঋণ মানেই পাচার করা অর্থ নয়। কোনো ঋণগ্রহীতা ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে ঋণ পরিশোধে অক্ষম হতে পারেন। আবার কোনো ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া, প্রকৃত মালিকানা গোপন করা কিংবা অপরাধলব্ধ অর্থকে বৈধ দেখানোর চেষ্টা থাকতে পারে। নির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আর্থিক নথি, অর্থের প্রবাহ ও তদন্তের ফলাফল যাচাই করা অপরিহার্য।
অর্থ পাচারের একটি পরিচিত পদ্ধতি হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্যের প্রকৃত মূল্য বিকৃত করে দেখানো। আমদানির ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে পাঠানো হলে তাকে অতিমূল্যায়ন বলা হয়। রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখিয়ে আয়ের অংশবিশেষ বিদেশে রেখে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের লেনদেন শনাক্ত করতে ব্যাংকের শুধু চালান ও ঋণপত্র যাচাই করলেই চলে না; পণ্যের বাজারদর, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, পরিবহন নথি এবং অর্থপ্রদানের যৌক্তিকতাও পরীক্ষা করতে হয়।
অফশোর ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি মুদ্রায় আমানত গ্রহণ ও বৈধ বাণিজ্যিক লেনদেন পরিচালনার জন্য অফশোর ব্যাংকিং ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা গোপন রাখা, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন কিংবা পণ্য সরবরাহের সঙ্গে অর্থপ্রদানের অসামঞ্জস্য থাকলে এই ব্যবস্থার অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই বৈধ অফশোর কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত না করে সন্দেহজনক লেনদেনের ওপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
প্রচলিত হুন্ডির পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক মাধ্যম, অনলাইন জুয়া, বৈদেশিক মুদ্রার অনিয়ন্ত্রিত লেনদেন এবং ক্রিপ্টোসম্পদ ব্যবহার করেও অর্থের উৎস ও গন্তব্য আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রচলিত নজরদারি পদ্ধতির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ, আন্তদেশীয় তথ্য বিনিময় এবং প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ অপরিহার্য।
অর্থ পাচারের ফলে দেশের বৈধ বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ বাড়তে পারে এবং করব্যবস্থার ন্যায্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিবর্তন বা বিনিময়হারের ওঠানামার জন্য শুধু অর্থ পাচারকে দায়ী করা যাবে না; রপ্তানি, প্রবাসী আয়, আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের দায়ও এসব সূচককে প্রভাবিত করে।
আর্থিক গোয়েন্দা নজরদারি: প্রতিবেদন বাড়ছে, তদন্ত কতটা কার্যকর? অর্থ পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা এর অন্যতম প্রধান কাজ।
প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা পড়ে। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩৪৫। অর্থাৎ প্রতিবেদন বৃদ্ধির হার প্রায় ৭৪ শতাংশ। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন এবং ৯ হাজার ৬৭৫টি ছিল সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদন। একই অর্থবছরে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার কাছে ১৯৯টি আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাঠায়।
এই বৃদ্ধি একদিকে নজরদারি ও প্রতিবেদন দাখিলের সক্ষমতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়; অন্যদিকে সন্দেহজনক আর্থিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। তবে প্রতিবেদন বৃদ্ধিকে সরাসরি অর্থ পাচার বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। উন্নত প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোরতা এবং আগে অনুল্লেখিত লেনদেন শনাক্ত হওয়ার কারণেও প্রতিবেদন বাড়তে পারে।
এখন প্রয়োজন এসব প্রতিবেদন থেকে কতটি কার্যকর তদন্ত শুরু হয়েছে, কতটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, কতটি ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে এবং কত সম্পদ আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে—তার স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা। কারণ সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা প্রথম ধাপ; অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ, বিচার এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারই শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ধারণ করে।
বিচারহীনতার ঝুঁকি ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ। আর্থিক অপরাধের বিচার দীর্ঘায়িত হলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। জটিল আর্থিক লেনদেন, একাধিক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং বিভিন্ন দেশের আইনি প্রক্রিয়ার কারণে এসব মামলার তদন্ত সাধারণত সময়সাপেক্ষ হয়। কিন্তু তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা যেন প্রমাণ নষ্ট করা, সম্পদ সরিয়ে নেওয়া কিংবা দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রথমে প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস শনাক্ত করতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি ব্যবস্থার আওতায় সম্পদ জব্দ, হিসাব স্থগিত বা বাজেয়াপ্ত করার আবেদন করা যেতে পারে। এসব পদক্ষেপ এক নয়। কোনো সম্পদ শনাক্ত হওয়া বা সাময়িকভাবে জব্দ হওয়া মানেই তা বাংলাদেশের হাতে ফিরে এসেছে, এমন দাবি করা সঠিক নয়।
আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ পুনরুদ্ধার বিশেষজ্ঞদের সহায়তা এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। তবে চুক্তির শর্ত, সম্ভাব্য ব্যয়, সাফল্যভিত্তিক পারিশ্রমিক এবং তথ্যের গোপনীয়তা সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রতিটি পর্যায়ে প্রমাণের মান, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যাংকিং খাতের অপরাধের বিচার দ্রুত করতে বিশেষায়িত আর্থিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে শুধু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রায় দেওয়ার লক্ষ্য স্থির করলেই চলবে না; পর্যাপ্ত বিচারক, দক্ষ আর্থিক তদন্তকারী, মানসম্মত প্রমাণ উপস্থাপন এবং আপিলের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচারকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবেই দেখতে হবে।
সংস্কারের রূপরেখা: স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি ও জবাবদিহি। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের প্রথম শর্ত হলো ঋণ অনুমোদন ও তদারকিতে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা। ঋণগ্রহীতার প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা, আর্থিক সক্ষমতা, বিদ্যমান ঋণ এবং পরিশোধের ইতিহাস যাচাই বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করতে হবে। একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত ঋণঝুঁকি মূল্যায়নের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশে আন্তর্জাতিক মানের হিসাব ও শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ যেন অনাদায়ী ঋণ আড়াল করার মাধ্যম না হয়, সে জন্য কঠোর শর্ত ও স্বাধীন পর্যালোচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া উদ্যোক্তাদের আলাদা করে মূল্যায়ন করতে হবে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, স্বাধীন নিরীক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন এবং অনিয়ম শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হবে। দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ কিংবা অন্য উপযুক্ত সমাধানের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমানতকারীদের স্বার্থ ও আর্থিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে।
চতুর্থত, অর্থ পাচার শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অস্বাভাবিক লেনদেনের ধরন চিহ্নিত করা যেতে পারে। তবে প্রযুক্তিগত সতর্কসংকেতকে অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। প্রশিক্ষিত তদন্তকারী, মানবিক পর্যালোচনা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং স্বাধীন নিরীক্ষার সমন্বয় অপরিহার্য।
পঞ্চমত, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, কর কর্তৃপক্ষ, তদন্তকারী সংস্থা এবং বিদেশি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে।
ষষ্ঠত, আমানতকারীদের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নে ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করে। এ কর্মসূচিতে আমানত সুরক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা, সংকটাপন্ন ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ অর্থায়নের কার্যকারিতা নির্ভর করবে স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সংস্কারের অগ্রগতি পরিমাপের ওপর।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট কেবল খেলাপি ঋণের বিপুল পরিমাণ কিংবা অর্থ পাচারের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, আর্থিক নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা এবং আইনের সমান প্রয়োগের প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের অনিয়মের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ করা সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা, কিন্তু সেই তথ্যকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করাই হবে মূল পরীক্ষা।
ব্যাংকিং খাতের অর্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব সম্পত্তি নয়। এটি সাধারণ মানুষের সঞ্চয়, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত সম্পদ। তাই আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণ অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তি এবং বিদেশে স্থানান্তরিত সম্পদ আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সব খেলাপি ঋণ অর্থ পাচারের প্রমাণ নয় এবং সব ব্যাংকের পরিস্থিতিও এক নয়। প্রকৃত আর্থিক সংকট, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও প্রমাণিত আর্থিক অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখেই কার্যকর সংস্কার সম্ভব। ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বাধীন তদারকি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা কোনো সাময়িক প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। বাংলাদেশ যদি ব্যাংকিং খাতকে প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে পারে, তাহলে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হবে। অন্যথায় অনিয়মের আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ আমানতকারী, সৎ উদ্যোক্তা এবং করদাতাদেরই।

