বৈশ্বিক সাইবার হুমকির আশঙ্কায় আগেভাগে বন্ধ রাখার পরও রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইট হামলার শিকার হয়েছে। ওয়েবসাইটের অন্তত দুটি জায়গায় হামলার আলামত পাওয়া গেছে। ফলে ছুটি শেষে রোববার (২৫ অক্টোবর) ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হলেও বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সাইটটি চালু করা যায়নি। ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মীরা ত্রুটি সারাতে কাজ করছেন।
ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়েবসাইটের দুটি স্থানে আক্রমণের চিহ্ন মিলেছে। সংশ্লিষ্ট দুর্বলতাগুলো শনাক্ত করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে। তাঁদের আশা, আজই সাইটটি পুরোপুরি নিরাপদ করে আবার সচল করা যাবে।
ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট বুঝতে একটু পেছনে তাকানো দরকার। গত ২১ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এনিসাসহ আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থা যৌথভাবে একটি সতর্কবার্তা দেয়। বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়ায় এই সতর্কতা জারি হয়। সংস্থাগুলোর ভাষ্য, এই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা আক্রান্ত সার্ভারে দূর থেকে ক্ষতিকর কোড চালাতে পারে।
সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়, দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ বা প্যাচ প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ্লিকেশন সাময়িকভাবে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখাই নিরাপদ।
এই নির্দেশনা মেনেই গত বৃহস্পতিবার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাধারণের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। ছুটি শেষে আজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পোর্টাল স্বাভাবিকভাবেই চালু হয়েছে। কিন্তু জনতা ব্যাংকের সাইটে ম্যালওয়্যার সংক্রমণের প্রমাণ মেলায় সেটি আর চালু করা যায়নি।
এ ঘটনার সময়টিও লক্ষ্য করার মতো। গত ১৯ অক্টোবর সরকার জনতা ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমানের নিয়োগের বাকি মেয়াদ বাতিল করে। এরপর দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ব্যাংক খাতে টানা পাঁচ দিনের ছুটি শুরু হয়। বর্তমানে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ শূন্য। এ কারণে হামলা নিয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি কয়েকটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ওয়েবসাইট বন্ধ থাকা অবস্থাতেও সংক্রমণ ঘটেছে। এতে প্রশ্ন ওঠে, হামলা কি বন্ধ করার আগেই হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো পথে সার্ভারে ঢোকা হয়েছে। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি, তাই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখলে হামলার উৎস ও ধরন পরিষ্কার হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পাঁচ দিনের দীর্ঘ ছুটিতে প্রযুক্তি ব্যবস্থার নজরদারি সাধারণত কমে যায়। এমন সময়ে সাইবার ঝুঁকি বাড়ে বলে বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই সতর্ক করেন। তবে এই ঘটনায় সেটি কারণ ছিল কি না, তা যাচাই ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ শূন্য থাকা প্রতিষ্ঠানটির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। সংকটের সময় আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো শীর্ষ নেতৃত্ব না থাকায় গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে পরিস্থিতি স্পষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ব্যাংকিং খাতে ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা শুধু তথ্য প্রদর্শনের বিষয় নয়। অনেক সময় এই সাইটের মাধ্যমেই ব্যাংকের বিভিন্ন সেবা ও তথ্য সরবরাহ হয়। তাই সংক্রমণের পরিধি কতটা, গ্রাহকের কোনো তথ্য ঝুঁকিতে পড়েছে কি না, এসব বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যদিও প্রতিবেদনে গ্রাহকের তথ্য ফাঁসের কোনো ইঙ্গিত নেই।
আপাতত ব্যাংকের লেনদেন স্বাভাবিক রয়েছে। ওয়েবসাইট পুরোপুরি নিরাপদ করে কখন চালু করা যাবে, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে।

