দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে নতুন করে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দিতে যাচ্ছে আটটি বেসরকারি ব্যাংক। একই সঙ্গে গ্রুপটির নামে ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুযোগ দিতেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে নীতিগত ছাড় পেতে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো।
এ ছাড়া যেসব ব্যাংকে সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে, সেগুলো নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খেলাপিমুক্ত রাখতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আসন্ন রমজানের আগে গ্রুপটির কার্যক্রম সচল রাখা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। বৈঠকে ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ ও সরোয়ার হোসেন এবং সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান উপস্থিত ছিলেন। ব্যাংকগুলোর পক্ষে অংশ নেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যাংক এশিয়ার সোহেল আর কে হুসেইন, ব্র্যাক ব্যাংকের তারেক রেফাত উল্লাহ খান, প্রাইম ব্যাংকের ফয়সাল রহমান, ইস্টার্ন ব্যাংকের হাসান ও. রশিদ, পূবালী ব্যাংকের মোহাম্মদ আলী এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের খালিদ মাহমুদ খানসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকের প্রতিনিধি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিটি গ্রুপ ও ব্যাংকগুলোকে নিয়ে বৈঠকে বসেছিল। তাঁর ভাষ্য, কয়েকটি ব্যাংক ইতিমধ্যে গ্রুপটির ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করেছে। ব্যাংকগুলোর আবেদনের ভিত্তিতে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ সাপেক্ষে ঋণ খেলাপিমুক্ত রাখতে বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি দেশের স্বনামধন্য শিল্পগোষ্ঠী, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায় না এটি আরও খারাপ অবস্থায় পড়ুক। সে কারণেই বিশেষ সুবিধা দিতে তারা সম্মত।
সংকটের গভীরতা বোঝা যায় ঋণের অঙ্ক দেখলে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের মোট ঋণের স্থিতি ছিল ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋণ ১৬ হাজার ২৪৬ কোটি এবং নন-ফান্ডেড ঋণ ৭ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। পরে এই ঋণ বেড়ে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নতুন যে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা হচ্ছে, তা মোট ঋণের তুলনায় সীমিত, মূলত ব্যবসা চালু রাখার জন্য চলতি মূলধন জোগানোর উদ্দেশ্যে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সিন্ডিকেশন ব্যবস্থার আওতায় সিটি ব্যাংক দেবে ৩০০ কোটি টাকা। বাকি সাতটি ব্যাংকের প্রতিটি দেবে ২০০ কোটি টাকা করে। হিসাব মিলিয়ে দেখলে ৩০০ কোটি ও ১ হাজার ৪০০ কোটি মিলে মোট ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হয়। তবে তিনি জানান, ঋণটি এখনো ব্যাংকগুলোর পর্ষদে অনুমোদন পায়নি। অনুমোদনের সম্ভাবনা আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রক্রিয়াটি কীভাবে চলবে, তারও কিছু রূপরেখা পাওয়া গেছে। যেসব ব্যাংক নতুন ঋণ দেবে, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করবে। আর যারা নতুন সিন্ডিকেটেড ঋণে যুক্ত হবে না, তারা বিদ্যমান ঋণ পুনঃতফসিল করবে। তবে দুই পক্ষকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করতে হবে। পুরো বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে আরও বৈঠকে বসতে হবে।
বৈঠকে কয়েকটি ব্যাংক গ্রুপটির ঋণ আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত অশ্রেণিকৃত রাখার বিশেষ ছাড় চেয়েছে। তাদের যুক্তি, এতে সিটি গ্রুপের ব্যবসা সচল থাকবে এবং বকেয়া ঋণ আদায়ের সম্ভাবনাও বাড়বে।
এর পেছনে একটি দীর্ঘ প্রেক্ষাপট আছে। সিটি গ্রুপ আগে শ্রেণিকরণের ঝুঁকিতে থাকা ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ ১২ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের আবেদন করেছিল। পাশাপাশি অতিরিক্ত ৬ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন চেয়েছিল। ঋণ শ্রেণিকরণ স্থগিত রাখাসহ মোট সাত ধরনের নীতি সহায়তা চেয়ে তারা গভর্নরকে চিঠি দেয়। পরে এবিবিও একই বিষয়ে গভর্নরকে চিঠি পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রুপটির ঋণের বিদ্যমান শ্রেণিমান ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখার অনুমতি দেয়। ফলে ওই সময় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি করতে হয়নি।
কিন্তু সেই সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর বাড়ানো হয়নি। এর ফলে গ্রুপটির অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি হয়ে পড়ে। তখন নতুন ঋণ পাওয়া এবং এলসি খোলার পথও বন্ধ হয়ে যায়।
এখানে আইনি বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭ক (৩) ধারায় খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে নতুন ঋণ সুবিধা দেওয়া নিষিদ্ধ। এ কারণে খেলাপি হয়ে যাওয়া সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ঋণ ও এলসি পাচ্ছে না। তবে একই আইনের ১২১ ধারায় সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এই বিধান থেকে অব্যাহতি দিতে পারে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধা দেওয়ার অনুমতি চেয়েছে আট ব্যাংক।
ঋণ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে কিছু শর্তের কথাও জানা গেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং মূল ব্যবসার বাইরে বিনিয়োগের কারণে গ্রুপটি সংকটে পড়েছে। কীভাবে এই সংকট থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বের করে আনা যায়, বৈঠকে তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। যেসব ব্যাংক নতুন অর্থায়ন করবে, তাদের জন্য একটি এসক্রো অ্যাকাউন্ট রাখা হবে। নতুন অর্থায়ন থেকে যে আয় আসবে, তা শুধু অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলোই পাবে। অন্য কোনো ব্যাংক ওই অর্থে ভাগ বসাতে পারবে না। এতে নতুন ঋণদাতারা কিছুটা সুরক্ষা পাবেন।
গ্রুপটির বকেয়া ঋণ সমন্বয়ে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে ঋণের ডাউন পেমেন্টের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ছাড় দেওয়া সম্ভব হবে না। মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, গ্রুপটি খেলাপি হওয়ায় নতুন অর্থায়নের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাক, তা চায় না বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কোনো ব্যাংককে ঋণ দিতে বাধ্য করা হবে না। ঋণ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। জামানত নিশ্চিত করতে সিটি গ্রুপকে স্থাবর ও অস্থাবর সব সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে।
আরেকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, সাত-আটটি ব্যাংক গ্রুপটিকে নতুন অর্থায়ন করছে, অথচ আরও অনেক ব্যাংকে তাদের ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। তাঁর মতে, গ্রুপটির বিভিন্ন ব্র্যান্ড টিকিয়ে রাখতে এবং আসন্ন রমজানের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া জরুরি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থেও প্রতিষ্ঠানটির আমদানি কার্যক্রম সচল থাকা প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধা না পেলে গ্রুপটির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় আরও কঠিন হবে। এ কারণেই আইনি ছাড় চাওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিষয়টির দুটি দিক স্পষ্ট। একদিকে ব্যাংকাররা মনে করছেন, ব্যবসা সচল না থাকলে বিপুল অঙ্কের বকেয়া ঋণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে যাবে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে নতুন ঋণ দেওয়ার বিধান শিথিল করা নিয়ে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও নজিরের প্রশ্নও উঠতে পারে, বিশেষ করে যেখানে অন্য অনেক ঋণগ্রহীতা একই সুবিধা পান না। এখন দেখার বিষয়, ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ঋণ অনুমোদন করে কি না, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত ছাড় দেয় কি না এবং সিটি গ্রুপ সম্পদ বিক্রি ও ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করতে পারে।

