ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সন্দেহজনক লেনদেন তদারক করা বাংলাদেশ ব্যাংকের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগের অন্যতম প্রধান কাজ। সেই বিভাগেরই একজন যুগ্ম পরিচালকের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তাঁর আয়কর নথিতে নেই এমন হিসাবে বড় অঙ্কের টাকা জমা ও উত্তোলন হয়েছে। বেতন-ভাতার পুরোটা ঋণ ও বাসা ভাড়ায় কেটে নেওয়া হলেও তিনি একের পর এক জমি কিনেছেন এবং নিজের ও স্ত্রীর নামে সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর করেছেন। তবে কর্মকর্তা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, সব লেনদেনের ব্যাংকিং রেকর্ড আছে এবং কোনো অবৈধ অর্থ তাঁর হিসাবে ঢোকেনি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নাম মো. মোশাররফ হোসেন। তিনি ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেন এবং বর্তমানে পঞ্চম গ্রেডের বেতনভুক্ত। তাঁর মূল বেতন ৫৬ হাজার ৩০ টাকা। অন্যান্য ভাতাসহ মাসে প্রায় ৯০ হাজার টাকা পান। গৃহনির্মাণ ও গাড়ি ঋণের কিস্তি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কোয়ার্টারের ভাড়া কেটে নেওয়ার পর বেতনের এক টাকাও তাঁর হিসাবে যায় না। প্রতিবেদকের হাতে থাকা সমিতির হিসাব বিবরণীতেও দেখা যায়, সব কর্তনের পর প্রতি মাসে প্রতীকী ৫ পয়সা জমা হয়েছে।
ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। ২০১৯ সালে ৪ শতাংশ সুদে গৃহনির্মাণ ঋণ নিয়েছিলেন তিনি, যার বকেয়া স্থিতি এখন ১ কোটি ২ লাখ ২৯ হাজার টাকা। গাড়ি কেনার জন্য নেওয়া ৩০ লাখ টাকার ঋণের বকেয়া ২৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। অথচ তাঁর আয়কর নথিতে কৃষি সম্পত্তি কেনা দেখানো হয়েছে ৭৯ লাখ টাকার, আর অকৃষি জমি বা ভবন নির্মাণ ব্যয়ের ঘরে শূন্য। প্রতিবেদকের ভাষ্য, এর অর্থ হলো গৃহনির্মাণ ঋণ নিয়ে তিনি বাড়ি নির্মাণ করেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মচারী সমবায় সমিতিতে তাঁর হিসাবের ২২ মাসের লেনদেনের তথ্য প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সেখানে বোনাস ও বিভিন্ন ভাতার বাইরে ৩৭ লাখ ৫ হাজার টাকা জমা হয়েছে। এর মধ্যে ভাউচারে নগদ জমা ২৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা, আর অন্য ব্যাংক থেকে ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে এসেছে ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। হিসাব বিবরণীতে এসব অর্থের উৎস উল্লেখ নেই। চলতি বছরের জানুয়ারিতে একবারে ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ঢুকেছে। মার্চে পাঁচ দফায় নগদ জমা হয়েছে ১২ লাখ ৫ হাজার টাকা। জুলাই ও আগস্টে আরও ৫ লাখ করে নগদ জমা পড়েছে।
সমিতির বাইরে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকেও তাঁর একটি সঞ্চয়ী হিসাবের সন্ধান পেয়েছে প্রতিবেদক। ২০১৯ সালের মার্চে খোলা এই হিসাবের তথ্য আয়কর বিবরণীতে নেই। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এতে মোট ২ কোটি ২১ লাখ ৭২ হাজার টাকা জমা হয়েছে। প্রায় সমপরিমাণ অর্থ তোলা হয়েছে, ফলে বর্তমান স্থিতি মাত্র ৩ হাজার ৪৫০ টাকা। এই হিসাবে সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য ৪০ লাখ টাকা জমা হলেও আয়কর নথিতে তা নেই। নগদ জমা হয়েছে ৪০ লাখ ৪০ হাজার ৭৩৭ টাকা, অন্য ব্যাংক থেকে এসেছে ২৪ লাখ ৮০ হাজার ৫০ টাকা এবং শেয়ার কেনাবেচা ও লভ্যাংশ বাবদ জমা হয়েছে ২৯ লাখ ৪০ হাজার ১৮৮ টাকা।
আরেকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মোবাইল আর্থিক সেবায়। ২০২১ সালে তাঁর ব্যক্তিগত নম্বরে খোলা বিকাশ হিসাবে পেশার ঘরে লেখা আছে ‘মালিক, মুদি দোকান, সবুজবাগ, ঢাকা’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিপর্যায়ে বড় লেনদেন হলে তা সন্দেহজনক লেনদেন হিসেবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) জানানো হয়। লেনদেনের তথ্য আড়াল করতেই তিনি এমন পরিচয় দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনের দাবি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তথ্য গোপন করা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অপরাধ। অবশ্য এ বিষয়ে কোনো আইনি সিদ্ধান্ত বা তদন্ত প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
তাঁর স্ত্রীর হিসাবেও বড় অঙ্কের জমার তথ্য মিলেছে। উম্মে হাসান ডলি ২০২১ সালে জনতা ব্যাংকে ২৬ হাজার ৪০০ টাকা বেতনে চাকরিতে যোগ দেন। এখন সব মিলিয়ে মাসে পান প্রায় ৩০ হাজার টাকা। চাকরির শুরু থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বেতন-ভাতা পেয়েছেন মোট ১৮ লাখ ৪২ হাজার টাকা। অথচ জনতা ব্যাংকের কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ শাখায় তাঁর হিসাবে জমা হয়েছে ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যা বেতনের প্রায় ১০ গুণ। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের আরেকটি হিসাবে জমা পড়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব অর্থের বড় অংশ এসেছে মোশাররফের হিসাব থেকে।
জনতা ব্যাংকের এই হিসাবে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কেবল বেতন-ভাতা জমা হতো। একই বছরের নভেম্বরে হঠাৎ ৮ লাখ টাকা নগদ জমা পড়ে। এরপর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমা হয়েছে আরও ৩৫ লাখ টাকা। চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি একবারেই জমা হয়েছে ২২ লাখ টাকা। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের হিসাবে স্ত্রীর নামে ৪৩ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ২৩ লাখ, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১০ লাখ, একই বছরের সেপ্টেম্বরে ৫ লাখ এবং নভেম্বরে ২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনা হয়েছে। এই হিসাবে নগদ জমা হয়েছে ২৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, আর অন্য হিসাব থেকে ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে এসেছে ১৯ লাখ টাকা।
জমি কেনার তথ্যেও অসংগতির কথা বলছে সমকাল। আয়কর রিটার্নে গাজীপুরের ভূরুলিয়া মৌজায় ৭৯ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা মূল্যের তিনটি জমির মালিকানা দেখিয়েছেন তিনি। এর একটি ২০১৯ সালে মোছা. আছমা আক্তার ও জামান মোল্লার কাছ থেকে কেনা ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ জমি, দাম দেখানো হয়েছে ৪০ লাখ ২৫ হাজার টাকা। আরেকটি দলিলে ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ টাকায় কিনেছেন ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জমি। এর মধ্যে নিজের নামে ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ ২১ লাখ ১৮ হাজার ৪৩৬ টাকায় এবং নাবালক পুত্রের নামে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৩৬৪ টাকায়। এই জমিগুলোর বিক্রেতা স্থানীয় অপূর্ব চন্দ্র পাল, অমল চন্দ্র পাল ও মাধবী পাল।
এর বাইরে একই মৌজায় আয়কর নথিতে নেই, এমন ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ জমির সন্ধান পেয়েছে সমকাল। দুটি দলিলের বিপরীতে অন্য দুজনের সঙ্গে যৌথভাবে এই জমি কেনা হয়েছে অপূর্ব চন্দ্র পাল ও অমল চন্দ্র পালের কাছ থেকে। দুটি দলিলের প্রতিটিতে জমির পরিমাণ ৩১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। যৌথ মালিকানার দুই ব্যক্তির বাড়ি মোশাররফের গ্রামের পাশের কাপাসিয়ার রাওনাট এলাকায়।
আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি পেশাগত আচরণ নিয়েও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। সমকাল জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ে অপেশাদার আচরণের বেশ কয়েকটি অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে, যার মধ্যে দুটি তদন্তাধীন। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২৬ ফেব্রুয়ারি, নতুন গভর্নর নিয়োগের দিন। অভিযোগ রয়েছে, ওই দিন মোশাররফের নেতৃত্বে কয়েকজন কর্মকর্তা মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি গভর্নর ড. কবির আহম্মদ ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলামকে জোর করে কিছু আদেশে সই করতে বাধ্য করেন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকে তদন্ত চলছে।
দ্বিতীয় ঘটনা তদবির-সংক্রান্ত। আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. এইচবিএম ইকবালের বিরুদ্ধে বিএফআইইউ যেন কোনো ব্যবস্থা না নেয়, সে জন্য একজন নির্বাহী পরিচালকের কাছে তদবির নিয়ে যান তিনি। এ সময় বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতার রেফারেন্স দেন বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় বিএফআইইউ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগে তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁকে প্রায়ই নিজ দপ্তরের কাজ ফেলে উচ্চপদস্থ নির্বাহীদের ফ্লোরে ঘুরতে দেখা যায়। অনেক সময় তদবির নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষে সরাসরি ঢুকে পড়েন। গত মাসে এক বিতর্কিত ব্যবসায়ীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিএফআইইউ প্রধানের কক্ষে যান। গত বছরের জানুয়ারিতে ঘোষিত বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধায় কিছু গ্রাহকের সুবিধা আদায়েও তিনি তৎপর ছিলেন বলে অভিযোগ। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের একটি সংগঠন তাঁর আচরণ নিয়ে গভর্নরের হস্তক্ষেপ চেয়ে মৌখিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছে।
অভিযোগের জবাবে মোশাররফ হোসেন বলেন, তাঁর সব লেনদেনের ব্যাংকিং রেকর্ড আছে। তাঁর দাবি, হিসাবে জমা হওয়া সব অর্থই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া গৃহনির্মাণ ও গাড়ি ঋণ, সঞ্চয়পত্র ভাঙানো টাকা এবং সহকর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া ধারের সঙ্গে সম্পর্কিত। জমির বিক্রেতা অমল চন্দ্র পালকে স্ত্রীর হিসাব থেকে ৪৮ লাখ টাকা পাঠানোর বিষয়ে তিনি বলেন, এই অর্থ গৃহনির্মাণ ঋণ ও মেয়াদি সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর টাকা থেকে এসেছে। সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জমির বায়নার টাকা পরিশোধের সুবিধার জন্য তিন মাসের জন্য স্ত্রীর নামে একটি এফডিআর করা হয়েছিল। মেয়াদ শেষে সেই টাকা জমির দাম পরিশোধে ব্যবহার হয়। মেয়াদ কম হওয়ায় তা আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়নি বলে তাঁর দাবি।
নিজের ও স্ত্রীর হিসাবে বড় অঙ্কের নগদ জমা-উত্তোলন সম্পর্কে তিনি জানান, এগুলো সহকর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ। গত তিন-চার মাসে সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা ধার নিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পেশা হিসেবে ‘মুদি দোকানদার’ লেখার বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা, বিকাশ এজেন্টের কাছে গিয়ে হিসাব খোলার সময় এজেন্টই ভুলবশত এটি লিখে দিয়েছেন। এই ভুল তথ্যের কথা তাঁর জানা ছিল না।
প্রতিবেদনের তথ্য ও কর্মকর্তার ব্যাখ্যা পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। যে পরিমাণ অর্থ সহকর্মীদের কাছ থেকে ধার নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে হিসাবে জমা হওয়া অঙ্কের ব্যবধান বড়। সমিতির হিসাবেই ২২ মাসে ৩৭ লাখ টাকার বেশি জমা পড়েছে, অথচ তাঁর নিজের দাবিতে সাম্প্রতিক ধার প্রায় ২০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ঋণের টাকা বাড়ি নির্মাণে খরচ না হলে তা কোথায় গেছে, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রতিবেদনে নেই। বিকাশ হিসাবের পেশা নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা এজেন্টের ভুলের দিকে ইঙ্গিত করে, যদিও প্রতিবেদনে হিসাব খোলার সাল ২০২১ বলা হয়েছে, আর তাঁর ব্যাখ্যায় এসেছে ২০১৯ সাল।
এখানে দুটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। প্রথমত, প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও অভিযোগ। কোনো সংস্থা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। দ্বিতীয়ত, আয়কর নথিতে উল্লেখ না থাকা বা লেনদেনের উৎস স্পষ্ট না হওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ আয় প্রমাণ করে না। তবে যিনি নিজেই সন্দেহজনক লেনদেন তদারকির বিভাগে কাজ করেন, তাঁর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব নজরদারিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখে কি না এবং আয়কর বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সংস্থা কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। চলমান তদন্ত দুটির ফলাফলও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: সমকাল

